৫৮ লক্ষ নাম বাদ! সুপ্রিম কোর্টে যাচ্ছে তৃণমূল

রাজন্যা নিউজ ব্যুরো, কলকাতা ভোটার তালিকা সংশোধন বা এসআইআর প্রক্রিয়া ঘিরে গুরুতর প্রশ্ন তুলে রাজ্য নির্বাচন কমিশনের সিইও-কে চিঠি দিলেন রাজ্যের মন্ত্রী ও তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য। তাঁর অভিযোগ, এএসডিডি ক্যাটাগরিতে ইআরও নেট থেকে প্রায় ৫৮ লক্ষ নাম বাদ দেওয়া হয়েছে, যা কোনও জেলা বা স্থানীয় স্তরের সিদ্ধান্ত নয়, বরং কেন্দ্রীয় স্তরের প্রক্রিয়ার মাধ্যমে করা হয়েছে।
খসড়া তালিকা প্রকাশের পরে শনিবার থেকে শুরু হয়েছে হিয়ারিং। কলকাতার ৪টি বিধানসভা কেন্দ্রের হিয়ারিং চলছে জোসপ বিল্ডিংয়ে। এদিন ডাক পেয়েছেন চৌরঙ্গী, এন্টালি, বেলেঘাটা, জোড়াসাঁকো বিধানসভার নো ম্যাপিং তালিকায় থাকা ভোটাররা। প্রাথমিক তালিকা অনুসারে ৩২ লক্ষের কাছাকাছি ভোটারদের ডাকা হয়েছে। ভোটাররা যেন হেনস্থার শিকার না হন, সেই দাবি নিয়ে সিইও দফতরে হাজির হয়েছেন তৃণমূলের ৩ সদস্যের দল।
চন্দ্রিমা ভট্টাচার্যের প্রশ্ন, ‘এই নামগুলি বাদ দেওয়া হল কেন? এটা কি সেই উদ্দেশেই করা হচ্ছে, যার ইঙ্গিত কিছু রাজনৈতিক দল আগেই দিয়েছিল-যে দু’কোটি নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ যাবে?’ তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, এই ধরনের প্রক্রিয়া তাঁরা কোনও ভাবেই মেনে নেবেন না। তিনি আরও অভিযোগ করেন, এর মাধ্যমে কার্যত ইলেক্টোরাল রেজিস্ট্রেশন অফিসারদের ক্ষমতা খর্ব করা হচ্ছে। তাঁর বক্তব্য, ‘ফার্স্ট অ্যাপিলেট অথরিটি হল ডিইও। কিন্তু যদি ইআরও স্তরেই নাম ‘ডিসপোজ’ করে দেওয়া হয়, তাহলে ডিইও-র ভূমিকা কোথায়?’
এদিকে শুনানির স্থান নির্ধারণ করা নিয়েও কমিশনকে আক্রমণ করেছেন চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য। তিনি বলেন, বহু ক্ষেত্রেই শুনানির জন্য ভোটারদের ৩০ থেকে ৪০ কিলোমিটার দূরে যেতে বলা হচ্ছে। একজন বয়স্ক মানুষ বা শারীরিকভাবে দুর্বল নাগরিকের পক্ষে এত দূরে গিয়ে শুনানিতে হাজির হওয়া কি আদৌ সম্ভব? এই প্রশ্নও তোলেন তিনি।
কমিশনের বিরুদ্ধে একইভাবে সরব হয়েছেন অরূপ বিশ্বাসও। তাঁর অভিযোগ, ভোটার তালিকা থেকে প্রায় ৫৫ লক্ষ নাম বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত কার্যত কেন্দ্রীয় সরকারই নিয়েছে, যা নির্বাচনী প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলছে। অরূপ বিশ্বাসের দাবি, ‘যে লক্ষ লক্ষ নাম বাদ দেওয়া হয়েছে, সেই তালিকা অবিলম্বে পাবলিক ডোমেইনে আনা উচিত। কোন কোন নাম বাদ গেছে, কী কারণে বাদ দেওয়া হয়েছে, এই তথ্য নির্বাচন কমিশন কেন গোপন রাখছে?’ তিনি অভিযোগ করেন, স্বচ্ছতার কোনও চিহ্ন এই প্রক্রিয়ায় নেই। ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার মতো সংবেদনশীল বিষয়ে সাধারণ মানুষের জানার অধিকার থাকা সত্ত্বেও কমিশন নীরব ভূমিকা নিচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি।
নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়েও সরাসরি প্রশ্ন তোলেন অরূপ বিশ্বাস। তাঁর কটাক্ষ, ‘এটা কি ইলেকশন কমিশনের অফিস, না কি বিজেপির অফিস?’ তাঁর অভিযোগ, কমিশনের আধিকারিকদের কাছে প্রশ্ন তুললে তাঁরা শুধু বলেন, বিষয়টি নির্বাচন কমিশনকে জানানো হবে।
অরূপ বিশ্বাস বলেন, ‘যদি এখানে বসে থাকা আধিকারিকরাই কোনও প্রশ্নের উত্তর দিতে না পারেন, তাহলে তাঁরা সেখানে বসে আছেন কেন?’ তাঁর মতে, এই আচরণ থেকেই স্পষ্ট হচ্ছে যে নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা নিয়ে গুরুতর সঙ্কট তৈরি হয়েছে। তৃণমূল কংগ্রেস স্পষ্ট অভিযোগ করছে, পুরো এসআইআর প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে ভয় দেখানো হচ্ছে এবং আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি করা হচ্ছে।
শুনানি শুরুর দিনই তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় বসলেন সাংবাদিক বৈঠকে। সেখান থেকে একের পর এক তোপ দাগলেন নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে। তাঁর প্রশ্ন, এত কম সময়ের মধ্যেই কমিশন কীভাবে ঘোষণা করল ১ কোটি ৩৬ লক্ষের লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি রয়েছে বাংলায়? এমনকী তিনি সুপ্রিম কোর্ট যাওয়ারও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন অভিষেক। তিনি বলেছেন, বিজেপি বলেছিল বাংলা হল আঁতুড়ঘর। অথচ বাকি যে সব রাজ্যে এসআইআর হচ্ছে, সেখানের থেকে কম সংখ্যক নাম বাংলায় বাদ গিয়েছে। পরিসংখ্যান দিয়ে অভিষেক দাবি করেন, তামিলনাড়ুতে মোট জনসংখ্যা ৭ কোটি ৭৫ লক্ষ, আর নাম বাদ গেছে ৫৭ লক্ষ ৩০ হাজারের। ১২.৫৭ শতাংশ। গুজরাতে জনসংখ্যা ৭ কোটি ৩৯ লক্ষ। বাদ যাওয়া ভোটারের সংখ্যা ৭৩ লক্ষ ৭৩ হাজার। প্রায় ১০ শতাংশ। ছত্তীসগড়ের জনসংখ্যা ৩ কোটি ১২ লক্ষ, বাদ যাওয়া ভোটারের ২৭ লক্ষ ৩৪ হাজার। শতাংশে ৮.৭৬। পশ্চিমবঙ্গের জনসংখ্যা ১০ কোটির কিছু বেশি আর নাম বাদ গেছে ৫৮ লক্ষ, শতাংশের বিচারে ৫ শতাংশ।
কমিশনের উচিৎ কান ধরে ক্ষমা চাওয়া। এমনকি তৃণমূল সাংসদ এ দিন এও অভিযোগ করেছেন লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি (নামে অসঙ্গতি) নিয়ে। এরপর সেই তালিকা বের করার কথাও জানিয়েছেন তিনি। পাশাপাশি কমিশনকে তালিকা বের করার সময়সীমাও বেঁধে দিয়েছেন।
অভিষেক বলেন, ‘কমিশন আপনি লোকাছেন কেন? বিজেপি লক্ষ্য মাত্রা বেঁধে দিয়েছিল তাই? আপনি বিজেপির কমিশনার না। নির্বাচন কমিশন হয় লিস্ট প্রকাশ করুন নাহলে ক্ষমা চান। ১ কোটি ৩৬ লক্ষের লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি? ইয়ার্কি? বিএলওদের কাজ করতে এত দিন লাগছে। আমরা সুপ্রিম কোর্টে যাব তো। কোন সফটওয়ার ব্যবহার করে ১ কোটি ৩৬ লক্ষ বাঙালিকে লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সিতে ঢোকালেন? ডানকুনিতে আমাদের এক কাউন্সিলর সূর্যকে মৃত দেখিয়ে দিয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *