‘জ্ঞানেশের হাতে রক্ত লেগে আছে’ ৪০ মৃতের তালিকা দিয়ে দাবি তৃণমূলের
রাজন্যা নিউজ, নয়াদিল্লি: শুক্রবার সকালে তৃণমূল কংগ্রেসের ১০ সদস্যের প্রতিনিধি দল নির্বাচন কমিশনের ফুল বেঞ্চের সঙ্গে দেখা করে। বৈঠকে পরে তৃণমূল কংগ্রেসের রাজ্যসভার সাংসদ ডেরেক ও ব্রায়েন অভিযোগ করেছেন, ‘এসআইআর আতঙ্কে রাজ্যে মোট ৪০ জনের মৃত্যু হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের হাতে রক্ত লেগে আছে। এদিকে এন্যুমারেশন ফর্ম ওয়েব সাইটে আপলোড করতে গিয়ে সার্ভারে সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে।’
নতুন করে মুর্শিদাবাদে একজন বিএলওর মৃত্যুর পরে মৃতের পরিবারের অভিযোগ, মাত্রাতিরিক্ত কাজের চাপ সামলাতে না পেরে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয়েছে জাকির হোসেন নামে চতুর্থজন বিএলওর। বৃহস্পতিবার রাতে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তাঁর মৃত্যু হয়েছে। উল্লেখ্য, গত ৪ নভেম্বর রাজ্যজুড়ে এন্যুমারেশন ফর্ম বিলি শুরু হয়েছে। ৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত ফর্ম বিতরণ করে জমা নেওয়ার কাজ শেষ করতে হবে বুথস্তরের আধিকারিকদের।
এই আবহে নির্বাচন কমিশনের ফুল বেঞ্চের সঙ্গে দেখা করার আবেদন জানিয়েছিল তৃণমূল কংগ্রেস। এদিন সকালে তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতিনিধি দল মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের সঙ্গে দেখা করে। সূত্রের খবর, ওই প্রতিনিধি দলের সদস্যদের মধ্যে ছিলেন রাজ্যসভার সাংসদ সাকেত গোখলে, ডেরেক ও’ব্রায়েন, দোলা সেন, মমতাবালা ঠাকুর এবং প্রকাশ চিক বরাইক। এছাড়াও ছিলেন লোকসভার সাংসদ মহুয়া মৈত্র, কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়, শতাধী রায়, প্রতিমা মণ্ডল এবং সাজদা আহমেদ।
এদিন নির্বাচন কমিশনের দফতর থেকে বেরিয়ে ডেরেক ও’ব্রায়েন অভিযোগ করেন,‘মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে এসআইআর নিয়ে আমরা পাঁচটি প্রশ্ন করি। আমাদের কোনও প্রশ্নেরই উত্তর মেলেনি।’ উল্লেখ্য, এদিন কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়, মহুয়া মৈত্র এবং মমতাবালা ঠাকুর মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে ৪০ মিনিট ধরে কথা বলেন। তাঁদের বক্তব্য জানান।
কৃষ্ণনগর লোকসভার সাংসদ মহুয়া মৈত্র জানিয়েছেন, এদিন তৃণমূলের প্রতিনিধি দল নির্বাচন কমিশনকে ৪০ জনের মৃত্যুর তালিকা জমা দিয়েছে। এঁদের মৃত্যু এসআইআরের কারণে হয়েছে। তবে কমিশন ওই অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছে। এদিন ডেরেক ও’ব্রায়েন বলেন, ‘তৃণমূল এসআইআর প্রক্রিয়ার বিরোধিতা করছে না। তবে এসআইআরের কাজ পরিকল্পনাহীনভাবে চলছে।’ উল্লেখ্য, এখনদেশের ৯টি রাজ্য এবং তিনটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে এসআইআর চলছে।
এসআইআরের নাম করে বাংলার একজনও যোগ্য ভোটারের নাম বাদ গেলে তৃণমূল কংগ্রেস যে বরদাস্ত করবে না, তা আগেই জানিয়েছিলেন তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। গত সোমবার এসআইআর বিরোধী আন্দোলন দিল্লিতে নিয়ে যাওয়ার হুঁশিয়ারি দেন অভিষেক।
শুক্রবার দেশের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক জ্ঞানেশ কুমারের সঙ্গে দেখা তৃণমূল কংগ্রেসের ১০ সদস্যের প্রতিনিধি দলের সদস্যরা টানা দুঘণ্টা বৈঠক করেন। ওই বৈঠকের পরে ডেরেক ও’ব্রায়েন বলেন, ‘আমরা বলেছি, তড়িঘড়ি এসআইআর করা যাবে না। এসআইআরের সঙ্গে মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার জড়িয়ে রয়েছে। সেই গুরুত্বপূর্ণ কাজ করতে এত তড়িঘড়ি করা হচ্ছে কেন?’
এদিন কমিশনের সঙ্গে বৈঠকের পরে তৃণমূল সাংসদ শতাধী রায় বলেন, ‘আমরা কমিশনের কাছে জানতে চেয়েছিলাম, এসআইআরের উদ্দেশ্য কী? ভুয়ো ভোটার চিহ্নিত করা নাকি অন্প্রুবেশকারীদের ধরা? দেশের সীমান্তবর্তী অন্য রাজ্যগুলিতে কেন এসআইআর চালু করা হচ্ছে না?’
এদিনের বৈঠকে তৃণমূলের ওই প্রতিনিধি দলের তরফে জানানো হয়, এসআইআর ঘোষণা হওয়ার পর একাজের সঙ্গে যুক্ত কর্মীদের উপর মানসিক চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। এমনকি চাকরি খেয়ে নেওয়ারও হুমকি দেওয়া হচ্ছে। প্রতিনিধি দলের সদস্য সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়, সাংসদ মহুয়া মৈত্র মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে বলেন, ‘যদি বর্তমান ভোটার তালিকা ভুয়ো হয়, তাহলে তো সর্বাগ্রে বর্তমান সরকার ফেলে দেওয়া উচিত। সেক্ষেত্রে তৃণমূল সাংসদদের ফের নির্বাচিত হয়ে আসা উচিত নয় কি?’
কমিশনের কাছে এদিন তৃণমূলের প্রতিনিধি দল অভিযোগ করেন, ‘নির্বাচন কমিশনের মতো স্বাধীন দায়িত্বপ্রাপ্ত একটি সংস্থা নিজেদের মতো কাজ না করে কেন বিজেপির কথা অনুসারে চলছে? বিজেপির নেতারা আগের দিন যে কথা বলছেন, পরের দিন কমিশনকে সেই একই কথা বলতে শোনা যাচ্ছে।’
বাংলায় কথা বললে বাংলাদেশি তকমা দিয়ে বাংলার পরিযায়ী শ্রমিকদের উপর ভিনরাজ্যে অত্যাচার করার একাধিক অভিযোগ সম্প্রতি সামনে এসেছিল। ওই ঘটনার সঙ্গে এসআইআরের যোগসূত্র নিয়েও কমিশনের কাছে এদিন জানতে চান তৃণমূলের প্রতিনিধিরা। এদিন ডেরেক ও ব্রায়েন অভিযোগ করেছেন, ‘যেভাবে এসআইআরের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার চেষ্টা হচ্ছে, তাতে স্পষ্ট যে, বিজেপির তৈরি রূপরেখা অনুযায়ী চলছে কমিশন। আমরা দাবি করেছি, আপাতত বাংলায় এসআইআর প্রক্রিয়া স্থগিত রাখা হোক। এছাড়া একজন প্রকৃত ভোটারের নাম বাদ গেলেও বৃহত্তর আন্দোলনে নামা হবে।’
সম্প্রতি তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতিনিধি দল কমিশনের সঙ্গে দেখা করতে চাইলে কমিশনের তরফে জানানো হয়েছিল, চারজনের বেশি সদস্য দেখা করতে পারবেন না। এরপর কমিশনকে খোলাখুলি চ্যালেঞ্জ জানিয়ে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘যদি নির্বাচন কমিশন সত্যিই স্বচ্ছ হয়, তাহলে মাত্র ১০ জন সাংসদকে ভয় কীসের? বরং খোলাখুলি বৈঠক করুন। এরপর তৃণমূলের দাবি মেনে ১০ সদস্যের প্রতিনিধি দলের সঙ্গে দেখা করেন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার।’ তৃণমূলের দাবি অনুযায়ী, ওই বৈঠকের লাইভ টেলিকাস্ট হয়নি। এখন দেখার তৃণমূলের দাবি মেনে কমিশন আগের অবস্থান থেকে সরে আসে কিনা।
