নবান্নে ইমামদের নিয়ে বৈঠক করলেন মুখ্যমন্ত্রী

রাজন্যা নিউজ ব্যুরো কলকাতা ইমামদের সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রীর বৈঠক সোমবার অনুষ্ঠিত হল নবান্নে। ইমামদের একাধিক বিষয় এ দিনের বৈঠকে আলোচনা হয়েছে বসে জানা গিয়েছে। আর সেই সঙ্গে আগামী বছরের শুরুতে হুগলির পুইনানে যে বিশ্ব ইজতেমা অনুষ্ঠিত হতে চলেছে সেখানে যাতে কোনও সমস্যা না হয় তা দেখার জন্য প্রশাসনকে নির্দেশ দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।
ক্ষমতায় আসার একবছর পর ইমাম ভাতা চালু করেছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ২০১২ থেকে ইমামরা প্রতি মাসে ২৫০০ টাকা করে পেতেন। ২০২৩-এর ২১ আগস্ট ৫০০ টাকা বেড়ে সেই ভাতা গিয়ে দাঁড়ায় ৩ হাজার টাকায়। শুধু ইমামরা নন, মোয়াজ্জিনরাও ভাতা পান। তবে তা ইমামদের থেকে কম। মোয়াজ্জিনরা প্রথমে পেতেন মাসিক ১ হাজার টাকা। ২০২৩-এর ইমামদের সঙ্গে তাঁদের ভাতাও বাড়ে ৫০০ টাকা। যদিও, মাত্র ৫০০ টাকা ভাতাবৃদ্ধিতে খুব-একটা সন্তুষ্ট নন ইমাম-মোয়াজ্জিনদের অনেকেই। এমতাবস্থায়, ছাব্বিশের বিধানসভার আবহে সোমবার নবান্নে মুখ্যমন্ত্র্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে ইমামদের বৈঠক রাজনৈতিক ভাবে খুবই তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
পর্যবেক্ষকদের কেউ কেউ বলছেন, শুধু ভাতাবৃদ্ধি নয়, এই বৈঠকের গুরুত্ব তার চেয়েও বেশি। চলতি বছরের ১৬ এপ্রিল মুসলিম ধর্মীয় নেতাদের স্পষ্ট জানান, এ-রাজ্যে ওয়াকফ সংশোধনী আইন চালু হতে দেবেন না তিনি। এমতাবস্থায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায় নিশ্চিন্তে থাকে। ঘটনার মোড় ঘোরে গত নভেম্বর মাসে।
চলতি বছরের ৬ জুন। কেন্দ্রীয় সরকার একটি নির্দেশিকা জারি করে। কেন্দ্রের উমিদ পোর্টালে যথাযথ নথি-সহ ওয়াকফ সম্পত্তি আপলোড করার করার কথা বলা হয়। আর সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয় ৬ মাস (৫ ডিসেম্বরের মধ্যে)। এমতাবস্থায়, নবান্ন কার্যত হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকে। বাংলার মুসলিম সমাজ আশা করে, রাজ্যের প্রশাসনিক প্রধান নিশ্চয় কোনো বিকল্প ব্যবস্থা করবেন, তাই চিন্তার কোনো কারণ নেই। কিন্তু, নভেম্বরের শেষের দিকে এসে, একেবারে শেষ মুহূর্তে, জেলা প্রশাসনকে নির্দেশিকা জারি করে নবান্ন, ৫ ডিসেম্বরের (শেষ দিন) মধ্যে কোথায় কত ওয়াকফ সম্পত্তি রয়েছে যেন নথি-সহ আপলোড করা হয়। এত অল্প সময়ে কয়েক হাজার সম্পত্তি, কয়েক হাজার নথি-সহ কীভাবে আপলোড করা যাবে, সেই ভেবে মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে সংখ্যালঘুদের। যদিও, এই সময়সীমা আরও ৬-মাস বাড়ানোর জন্য সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয় রাজ্য। শীর্ষ আদালত সেই আর্জি খারিজ করে।
পর্যবেক্ষকদের কেউ কেউ মনে করছেন, ওয়াকফ আইনকে কেন্দ্র করেই তৃণমূলের প্রতি রাজ্যের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ক্ষোভ বাড়ছে। রাজ্যের যে জেলায় কমবেশি ৭০ শতাংশ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বাস, সেই মুর্শিদাবাদে, হুমায়ুন কবীরের বাবরি-প্রকল্পে অগণিত মানুষের ভিড়ে যেন তৃণমূলের দেওয়াল-লিখনে পরিণত হয়েছে। মুসলিম সমাজের একটা বড় অংশ তৃণমূলের থেকে মুখ ফেরাচ্ছে। এমনকি, হুমায়ুনের প্রকল্প যদি বিজেপি-স্পনসর্ড হয়, তাতেও সমস্যা নেই, এমনই মনে করছেন মুসলিমদের একাংশ।
অন্যদিকে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ও শান্তিপূর্ণ ধর্মীয় সমাবেশ ‘বিশ্ব ইজতেমা’ হতে চলেছে হুগলির পুইনানে। জানুয়ারির শুরুতেই হবে এই সমাবেশ। আগামী ২ জানুয়ারি থেকে হুগলিতে এই ধর্মীয় সমাবেশ শুরু হবে। ৫ তারিখ পর্যন্ত এই সমাবেশ চলবে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে মুসল্লিরা ওই ধর্মীয় সমাবেশে অংশ নেবেন। চারদিনের ওই ধর্মীয় সমাবেশে লক্ষ লক্ষ মানুষ উপস্থিত হবেন বলে মনে করা হচ্ছে। হুগলির পোলবার দাদপুর এলাকায় ওই সমাবেশ হবে। সেই কর্মকাণ্ডের প্রস্তুতিও চলছে পুরোদমে। এই সমাবেশ যাতে সুষ্ঠুভাবে হয়, কোনও অপ্রীতিকর পরিস্থিতি যাতে তৈরি না হয়, সেজন্য কড়া নির্দেশ দিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ইমাম সংগঠনের নেতারা ছাড়াও ছিলেন মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস, ফিরহাদ হাকিম, সিদ্দিকুল্লাহ চৌধুরী-সহ অন্যান্যরা। ওই সমাবেশ যাতে সুষ্ঠুভাবে হয়, সেই বিষয়ে হুগলি জেলাশাসক ও প্রশাসনকে নির্দেশ দিলেন মুখ্যমন্ত্রী। লক্ষ লক্ষ মানুষ এই সমাবেশ হাজির হবেন। তাঁদের থাকা, খাওয়ায় যাতে কোনওরকম সমস্যা না হয়, যোগাযোগ ব্যবস্থাও যাতে ঠিক থাকে, সেই নির্দেশ মুখ্যমন্ত্রী দিয়েছেন। এই সমাবেশ চলাকালীন কোনও অশান্তির আবহও যাতে না তৈরি হয়, সেদিকেও কড়া নজর রাখতে প্রশাসনকে নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। ™শ্চিমবঙ্গ বরাবরই সর্বধর্ম সমন্বয়ের বার্তা দেন। বিভিন্ন উৎসব, অনুষ্ঠানে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী সকল ধর্মের প্রতি সম্মান, উদারতার বার্তা দেন। সব ধর্মের মানুষকে সঙ্গে নিয়ে চলার কথা বলেন তিনি। দিঘায় জগ্ননাথ মন্দির তৈরি হয়েছে। মহাকাল মন্দিরেও গিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। এবার ‘বিশ্ব ইজতেমা’ও যাতে সুষ্ঠুভাবে হয়, সেই নির্দেশ দিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *