পুরো ফিলিস্তিনকেই নিজেদের মানচিত্রে জুড়ে দিচ্ছে ইসরাইল

২৩ ডিসেম্বর গাজা

ধাপে ধাপে পুরো ফিলিস্তিনকে নিজেদের মানচিত্রে যুক্ত করার পথে এগোচ্ছে ইসরাইল। গাজায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও থামেনি তেল আবিবের দখলদার নীতি। বরং পশ্চিম তীরে ইসরাইলের আগ্রাসন আরও তীব্র হয়ে উঠেছে। নতুন করে দখলকৃত এলাকায় ১৯টি ইহুদি বসতি স্থাপনের অনুমোদন দিয়েছে ইসরাইলের মন্ত্রিসভা। স্বাধীন ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র গঠনের সম্ভাবনা নস্যাৎ করতেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
এরই ধারাবাহিকতায় গেল সপ্তাহে অধিকৃত পূর্ব জেরুসালেমের সিলওয়ান এলাকায় ১৩টি ফ্ল্যাটসহ একটি ভবন গুঁড়িয়ে দেয় ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ। এতে প্রায় ১০০ ফিলিস্তিনি বাসিন্দা গৃহহীন হয়ে পড়েন। রাষ্ট্রসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে ইসরাইলের বসতি সম্প্রসারণ কার্যক্রম। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকারের আমলে পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুসালেমে অবৈধ বসতি ও আউটপোস্টের সংখ্যা প্রায় ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
নতুন এই দখলদারিত্বের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে নাবলুস, রামাল্লা, সালফিত, বেথলেহেম ও জেরিকো এলাকায়। এতে প্রায় ৩০ লাখ ফিলিস্তিনির স্বাভাবিক জীবনযাপন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন বসতি স্থাপনের অনুমোদন মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি প্রক্রিয়া ও একটি স্বাধীন ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনাকে আরও অনিশ্চিত করে তুলছে। শুধু দখলদারিত্বেই সীমাবদ্ধ নেই ইসরাইলের কার্যক্রম। নিয়মিত চলছে অভিযান, ধরপাকড় ও হামলা। গাজায় যুদ্ধ চলাকালেও পশ্চিম তীরে ব্যাপক গ্রেফতার ও হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে ইসরাইলি বাহিনী। যুদ্ধবিরতির পর এসব হামলার মাত্রা আরও বেড়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
গাজায় যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত ইসরাইলের দখলকৃত বিভিন্ন এলাকায় এক হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। আহতের সংখ্যা আরও বেশি এবং গ্রেফতার করা হয়েছে ২১ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনিকে।
অন্যদিকে, গাজার ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে ইসরাইলের চালানো গণহত্যায় এখন পর্যন্ত অন্তত ৭০ হাজার ৯৩৭ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন এবং ১ লাখ ৭১ হাজার ১৯২ জন আহত হয়েছেন। সোমবার প্রকাশিত সর্বশেষ প্রতিবেদনে মন্ত্রণালয় জানায়, ১০ অক্টোবর থেকে কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতির পরও অন্তত ৪০৫ জন নিহত হয়েছেন এবং একই সময়ে ১ হাজার ১১৫ জন আহত হয়েছেন। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় আরও জানিয়েছে, ধ্বংসপ্রাপ্ত হাসপাতাল, ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জামের তীব্র সংকটের কারণে আহতদের চিকিৎসা দিতে মারাত্মক সমস্যা হচ্ছে, ফলে মৃত্যুসংখ্যা আরো বাড়তে পারে।
এদিকে সংযুক্ত পূর্ব জেরুসালেমে ‘অননুমোদিত নির্মাণ’ বলে বর্ণনা করা স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে ইসরায়েলি কর্মকর্তারা অভিযান চালাচ্ছে। এরই অংশ হিসেবে ইসরাইলি বুলডোজার সোমবার ভোরে পূর্ব জেরুসালেমে একটি চারতলা ভবন গুঁড়িয়ে দেয়। মধ্যরাতে কর্তৃপক্ষ দরজা ভেঙে দ্রুত উচ্ছেদ অভিযান চালানোর পর ভবনটিতে বসবাসকারী বহু ফিলিস্তিনি পরিবার কোথায় যাবে; তা নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়ে।
স্থানীয় ফিলিস্তিনি কর্মকর্তারা এ অভিযানকে বাসিন্দাদের উৎখাতের একটি ‘পদ্ধতিগত নীতি’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। ভবনটির বাসিন্দা ঈদ শাওয়ার বলেন, ‘এই ভাঙচুর সব বাসিন্দার জন্যই এক ভয়াবহ ট্র্যাজেডি।’ সিলওয়ান এলাকায়, পুরোনো শহরের কাছাকাছি অবস্থিত ভবনটিতে ছিল এক ডজনের মতো ফ্ল্যাট। সেখানে আনুমানিক ১০০ জন মানুষ থাকতেন; যাদের মধ্যে নারী, শিশু ও বয়স্করাও ছিলেন। পাঁচ সন্তানের বাবা শাওয়ার বলেন, ‘আমরা যখন ঘুমিয়ে ছিলাম, তখন তারা দরজা ভেঙে ঢোকে। আমাদের শুধু জামাকাপড় বদলানো আর প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নেওয়ার অনুমতি দেয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *