তৃণমূলের ঘাড়ে অনুপ্রবেশ দায়! শাহকে ‘ঘুসপেটিয়া’ তকমা অভিষেকের মমতা বললেন ‘দুঃশাসন’

রাজন্যা নিউজ ব্যুরো বাঁকুড়া:

শহর কলকাতায় বড়দিনের উৎসবের রেশ কাটতে না-কাটতেই ছাব্বিশের বিধানসভা নির্বাচনকে পাখির চোখ করে তপ্ত বাংলার রাজনীতি। মঙ্গলবার কলকাতায় যখন সাংবাদিক বৈঠক করছেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ, তখন বাঁকুড়ায় সভা করেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
কলকাতায় দাঁড়িয়ে অনুপ্রবেশ ও দুর্নীতি ইস্যুতে রাজ্য সরকারকে উৎখাতের ডাক দেন শাহ। আর বাঁকুড়ার বড়জোড়ার সভা থেকে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে ‘দুঃশাসন’ বলে বেনজির আক্রমণ করেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। একই সঙ্গে অনুপ্রবেশ ইস্যুতে ব্যর্থতার অভিযোগ তুলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদত্যাগও দাবি করেন মুখ্যমন্ত্রী।
নয়াদিল্লি যাওয়ার আগে বিমানবন্দরে দাঁড়িয়ে অভিষেক কটাক্ষ করেন, ‘স্বাধীনতার পর দেশের সবচেয়ে ব্যর্থ ও অপদার্থ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হলেন অমিত শাহ।’ অভিষেকের প্রশ্ন, ‘অনুপ্রবেশ কি শুধু বাংলাতেই হয়? পহেলগাঁও বা দিল্লিতে যে ঘটনা ঘটেছে, তার দায় কে নেবে?’ তাঁর দাবি, ওই সব জায়গায় তো তৃণমূল সরকার নেই। দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার সম্পূর্ণ দায়িত্ব স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের, আর সেই দায়িত্বে রয়েছেন অমিত শাহ। তাই কোথাও অনুপ্রবেশ বা নিরাপত্তার ব্যর্থতা হলে দায় এড়ানো যাবে না।
তৃণমূল সাংসদের আরও কটাক্ষ, ‘বিজেপির সাংসদরাই বলেন, দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী একজন ঘুসপেটিয়া। ২০১৪ সাল থেকে বিজেপি কেন্দ্রে ক্ষমতায়, আর গত ছয় বছর ধরে অমিত শাহ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। এত বছর পরও যদি অনুপ্রবেশ বন্ধ না হয়, তার দায় তো তাঁকেই নিতে হবে। আগে পদত্যাগ করুন, তারপর কথা বলুন।’
অন্যদিকে মঙ্গলবার বাঁকুড়ার বড়জোড়া বীরসিংহপুর ময়দানের জনসভা থেকে নাম না-করে অমিত শাহ ও বিজেপি কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকে তীব্র কটাক্ষ করেন তৃণমূল সুপ্রিমো। তিনি বলেন, ‘একজন দুঃশাসন এসেছেন বাংলায়। ভোট এলে দুর্যোধন আর দুঃশাসনরা আসেন। ওদের দেখলেই আতঙ্ক হয়।’ মুখ্যমন্ত্রীর অভিযোগ, ভোটের আগে ডেলি প্যাসেঞ্জারি শুরু করেছেন দিল্লির বিজেপি নেতারা। কিন্তু বাংলার সংßৃñতির সঙ্গে তাঁদের কোনও যোগ নেই।
এদিন সকালে পেট্রাপোল সীমান্তে দাঁড়িয়ে এবং পরে কলকাতায় সাংবাদিক বৈঠক থেকে অমিত শাহ অভিযোগ করেন, রাজ্য সরকার সীমান্তের কাঁটাতার বসানোর জন্য জমি দিচ্ছে না। যার ফলে অনুপ্রবেশ রোখা যাচ্ছে না। পশ্চিমবঙ্গে অনুপ্রবেশ শুধু বাংলার বিষয় নয়, পুরো দেশের নিরাপত্তা সংক্রান্ত প্রশ্ন। এ রাজ্যে এমন মজবুত সরকার দরকার যারা অনুপ্রবেশ পুরোপুরি বন্ধ করে দেবে।
বাঁকুড়ার সভা থেকে অমিত শাহের এই অভিযোগের কড়া জবাব দেন মমতা। তিনি বলেন, ‘মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জমি না-দিলে এই তারকেশ্বর-বি¡ুŒপুর লাইন কি করে গিয়েছে? বনগাঁ পেট্রাপোলে জমি কে দিয়েছে? চ্যাংড়াবান্ধা মালবাজারে জমি কে দিয়েছে?’ মুখ্যমন্ত্রী আরও বলেন, ‘সীমান্ত রক্ষা ও অনুপ্রবেশ রোখার দায়িত্ব বিএসএফ ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের। তিনি প্রশ্ন ছুড়ে দেন, ‘বাংলায় শুধু অনুপ্রবেশকারী? কাশ্মীরে নাকি নেই? তাহলে পহেলগাঁও হামলা কে করল? দিল্লি বিস্ফোরণ কে করল? আপনারা করলেন?’
ভোটার তালিকায় নিবিড় বিশেষ সংশোধন অর্থাৎ এসআইআর নিয়ে বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে তোপ দাগেন মুখ্যমন্ত্রী। রাজ্যস্তরে তথ্য যাচাইয়ের নামে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার চক্রান্ত চলছে বলে অভিযোগ করেন মমতা। তিনি বলেন, ‘এসআইআর করতে দু’মাস টাইম নিলে, আর বাদ দিতে দেড় কোটি লোককে দেড় দিন টাইম নিলে? এটা বড় কেলেঙ্কারি! ভ্রষ্টাচারী হোম মিনিস্টার রিজাইন করো! ইউ মাস্ট রিজাইন! তোমার পদত্যাগ চাই!’
অমিত শাহ এদিন দাবি করেছেন, ২০২৬ সালে দুই-তৃতীয়াংশ গরিষ্ঠতা নিয়ে বিজেপি বাংলায় ক্ষমতায় আসবে। এর জবাবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিজেপি’র পুরনো স্লোগান মনে করিয়ে দিয়ে বলেন, ‘বলছেন দুই-তৃতীয়াংশ ভোটে জিতবেন। এবার তো বলছেন না, ‘আব কি বার ২০০ পার।’ আমি বলতে চাই, এবার আপনাকে দেশ থেকে করা হবে বার।’ তিনি হুঁশিয়ারি দেন, বাংলা জিতে গণতান্ত্রিকভাবেই বিজেপিকে দেশ থেকে বিদায় করার পথ দেখাবে বাংলা। সবমিলিয়ে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বঙ্গসফর এবং মুখ্যমন্ত্রীর পাল্টা সভার জেরে রাজনৈতিক পারদ এখন তুঙ্গে। অনুপ্রবেশ ও এনআরসি ইস্যু যে আগামী বিধানসভা নির্বাচনে শাসক-বিরোধী মূল হাতিয়ার হতে চলেছে, তা এদিনের বাকযুদ্ধে স্পষ্ট।
অন্যদিকে, কলকাতায় সাংবাদিক বৈঠক করে অমিত শাহ দাবি করেন, সীমান্তে কাঁটাতার বসানোর জন্য রাজ্য সরকার জমি দিচ্ছে না। তাঁর কথায়, ‘গত ছয় বছরে সাতবার মুখ্যমন্ত্রীকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। তিনবার স্বরাষ্ট্রসচিব বাংলায় এসে বৈঠক করেছেন। তবু জমি পাওয়া যায়নি।’
এই প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও পাল্টা আক্রমণ শানিয়েছেন। বাঁকুড়ার সভা থেকে তিনি বলেন, ‘রাজ্য যদি জমি না দিত, তা হলে রেললাইন বা কয়লা প্রকল্প কীভাবে হয়েছে?’ একই সঙ্গে তাঁর প্রশ্ন, ‘শুধু বাংলাতেই অনুপ্রবেশ হয়? কাশ্মীরে হয় না?’ পহেলগাঁওয়ের জঙ্গি হামলার প্রসঙ্গ তুলে তিনি জানতে চান, ‘পহেলগাঁওয়ে কী হয়েছিল, তখন আপনারা কী করছিলেন?’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *