মিলনতীর্থ গঙ্গাসাগর এক টুকরো সম্প্রীতির ভারত
কল্যাণ অধিকারী, এডিটর রাজন্যা নিউজ
মকর সংক্রান্তির আগে পুণ্যভূমি গঙ্গাসাগর জুড়ে পুণ্যার্থীদের ঢল। ওপার কাকদ্বীপ এপার কচুবেড়িয়া মিলিয়েছেন ওঁরা। মাথায় বোঁচকা নিয়ে কপিল মুনির আশ্রম ও সাগর-সঙ্গম মুখি ইউপি, রাজস্থান, বিহার, ঝাড়খণ্ড, ছত্রিশগড়ের তীর্থযাত্রীরা। আজকের দিনটা সাগরের বেলাভূমিতে কাটাবে। খড়ের বিছানা ছেড়ে ভোর-ভোর উঠে সাগরে ডুবকি দেবে। তারপর কপিল মুনির মন্দিরে ডালা চড়ানো। সকালের আলো ফোঁটার সঙ্গেই মেলার ছবিটা স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠবে মিনি ভারতের সাগর পাড়ে।
মেলার গুরুত্বপূর্ণ ২নং রাস্তার পাশেই শাঁখাসিঁদুর কিনছেন ইউপি থেকে আগত বছর পঁচিশের লক্ষ্মী দেবী। ছেলের হাত শক্ত করে ধরে রেখেছেন। প্রথমবার গঙ্গাসাগরে এসেছেন যোগীর রাজ্যের সরকারী ক্লার্ক। ইহকাল-পরকাল বলে বুঝিনা। মা গঙ্গা মাইয়াকে জানিয়েছিলাম গঙ্গাসাগরে ডুবকি দিয়ে কপিল মুনির কাছে পুজো চড়াব। হাওড়া স্টেশন থেকে ভোরের সামান্য আলো ফুটতেই আমার রওনা দিয়েছিলাম। বিশ্বাস, ভক্তি আর বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করতেই এসেছি পবিত্র ভূমিতে। পাপ-পুণ্য সবটাই তো নিজের মধ্যে। নিঃশুল্ক যাত্রীনিবাসে রাত কাটিয়েছি। বিভিন্ন শিবিরেই ভোজন করেছি। সকালের চা থেকে খিচুড়ি। মেলার চতুর্দিক ঘুরে ঘুরে দেখেছি। আমরা দুদিন থাকব। রাজস্থান থেকে এসেছেন বৃন্দাবন ও তাঁর স্ত্রী উল্কি দেবী। বৃন্দাবন বাবুর কথায়, ইচ্ছে ছিল একবার দিদির রাজ্যে আসব। এখানকার কথা শুনি কিন্তু বাস্তবটা সম্পূর্ণ উল্টো। যেটুকু কাগজে পড়ি আর টিভিতে দেখি সবটাই তো বিরোধীমূলক। কত সুন্দর রাস্তাঘাট, নদীর উপর দিয়ে দেখলাম বিদ্যুতের লাইন। মানুষের প্রয়োজন যেটা সেটাতো দিতেই হবে।
নাসিক, উজ্জ্বয়নী, প্রয়াগরাজ কুম্ভেও গেছেন হরিয়ানার বাসিন্দা সহদেব মিশ্রা। হাঁড়িকুড়ি নিয়ে রান্নাবান্না, খড়ের বিছানায় শুয়ে থাকা সবটাই আমার অভ্যস্ত। এখানে এসেছেন মোট পঁয়তাল্লিশ জন। সাগরে স্নান সেরে গরুর লেজ ধরে পূজো দেওয়া। তারপর ভিক্ষুকদের পয়সার থালাতে পয়সা দেব। মেলার প্রতিটি রাস্তায় দেখার মতো কত কিছু রয়েছে! সত্যিই এখানে এসে যেটা দেখলাম নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারছি না। মুসলিমের হোটেলে মানুষজন বসে পাত পেড়ে খাচ্ছেন। ডাব বোঝাই ভ্যান নিয়ে দাঁড়িয়ে আকতার। দিব্যি ডাব খাচ্ছেন পিতলের কৃষ্ণ হাতে রাখা মহিলা। এখানে তো ব্যবসার শেষ নেই। মেলায় তিলের চাকতি, ভেটের খই, নকুলদানা, আলতা সিঁদুর বিক্রেতার অনেকাংশই বিহার-ইউপির বাসিন্দা। এটাই তো আমার ভারত। দিদি কদিন আগেই ইডির হাত থেকে ফাইল কেড়ে নিয়েছেন দেখেছি টিভিতে। এখানে এসে দেখলাম সত্যিই দিদির রাজ্যে সবকিছুই সম্ভব। সমগ্র ভারতকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছেন সাহসী, নির্ভীক ও বেপরোয়া দিদি।
আকাশের বুকে ঘুরে বেড়াচ্ছে দুধ সাদা হেলিকপ্টার। হেলিপ্যাড গ্রাউন্ড থেকে উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে ভিন রাজ্যের অসুস্থদের। তদারকি করছেন রাজ্যের পরিবহন মন্ত্রী স্নেহাশিস চক্রবর্তী। এদিন তিনি বলেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ভিন রাজ্যের তীর্থযাত্রীদের জন্য অভূতপূর্ব ব্যবস্থা নিয়েছেন। কেউ অসুস্থ হলে তাঁর অতিরিক্ত চিকিতসার প্রয়োজন হলে কলকাতায় পাঠানো হচ্ছে হেলিকপ্টারে। এদিন ৭৭ বছর বয়সি উত্তরপ্রদেশের রমেশচন্দ্রকে শ্বাসকষ্ট জনিত কারণে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। হেলিকপ্টারে নিয়ে যাওয়া হয়েছে কলকাতায়। অন্যদিকে শীতল রাতে খোল করতালের শব্দ আসছে ভেসে। কৃষ্ণ নামে মেতে উঠেছেন মানুষজন। কোথাও আবার একসঙ্গে বসে মুড়ি খাচ্ছেন তীর্থযাত্রিদের একাংশ। কুয়াশাঘেরা সকালে দেখা মিলল কবিতা মণ্ডল, রেবা বিশ্বাস, চঞ্চলা বাড়ুইদের সঙ্গে। সাগরসঙ্গমে স্নানে নেমেছেন বহু মানুষজন। কোনভাবে প্ল্যাস্টিক ফেললেই ছোঁ মেরে তুলে নিচ্ছেন। বোঝাচ্ছেন এভাবে যত্রতত্র প্ল্যাস্টিক না ফেলে। রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে সুমিত্রা, প্রিয়া, চন্দনারা। আগত তীর্থযাত্রীদের জানাচ্ছেন, হোগলা ঘরে হাঁড়িকুড়ি নিয়ে রান্নাবান্না যাতে কেউ না করে।
আজ বুধবার থেকে মকরসংক্রান্তির শুভ সময় শুরু। ইতিমধ্যেই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে গঙ্গাসাগরে ভিড় করেছেন পুণ্যার্থীরা। নানা বয়সের নানা মুখ, নানা অভিব্যক্তি৷ পুণ্যলাভের আশায় হাজার হাজার মাইল ছুটে আসা ভক্তকূল, ধ্যানমগ্ন সন্ন্যাসী, দেশি-বিদেশি অতিথিদের ভিড়ে জমজমাট। গলায় তুলসীর মালা আর খঞ্জনি বাজিয়ে চলেছেন বনগাঁর চারজন। কাপড়ের ঝুলিতে চাল আর খুচরো পয়সা। এবারে অন্যবারের তুলনায় ভিড় বেশি। তাই রুজিরোজগার বেশির আশায়। বিকেলে মেলা অফিসে সাংবাদিক সম্মেলনে মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস জানান, গত পয়লা জানুয়ারি থেকে মঙ্গলবার বিকেল পর্যন্ত ৬০ লক্ষ পুণ্যার্থী গঙ্গাসাগর মেলায় এসেছেন। মেলায় সমস্যটা নজরে রাখছেন মন্ত্রী অরুপ বিশ্বাস, সুজিত বসু, মানসরঞ্জন ভূঁইয়া, স্নেহাশিস চক্রবর্তী, পুলক রায়, বেচারাম মান্না ও বঙ্কিমচন্দ্র হাজরা-সহ বিভিন্ন দফতরের আধিকারিকরা।
পঞ্জিকা মতে, এবার বুধ ও বৃহস্পতিবার দুই দিনই মকর সংক্রান্তির তিথি। দু দিনই সাগরে পুণ্যস্নান করতে পারবেন পুণার্থীরা। দুপুর ১টা ১৯ মিনিট থেকে সূর্য মকর রাশিতে প্রবেশ করবে, তাই এই সময় থেকে পরের দিন দুপুর ১টা ১৯মিনিট পর্যন্ত পুণ্যকাল চলবে, তবে ১৫ জানুয়ারি দিনভর পুণ্যস্নানের দিন।
মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস বলেন, সাগরসঙ্গমে পুণ্যস্নানের স্মৃতি অক্ষয় করে রাখতে তীর্থযাত্রিদের সম্পূর্ণ বিনামূল্যে নিজের ছবি স্মবলিত শংসাপত্র বন্ধন নামে ১৩ টি ফটোবুথ থেকে পেয়ে যাচ্ছেন। এখনো পর্যন্ত ৪.৫ লক্ষ পুণ্যার্থী ছবি-সন শংসাপত্র সংগ্রহ করেছেন। ২৫টি পকেটমারির ঘটনা ঘটেছে। ২০ টি ক্ষেত্রে খোয়া যাওয়া বস্তু উদ্ধার করে সংশ্লিষ্ট ব্যাক্তিদের ফেরত দেওয়া হয়েছে। হারিয়ে যাওয়া ৮৮৯ জন তীর্থযাত্রীদের মধ্যে ৮৩৫ জন তীর্থযাত্রী প্রশাসন ও স্বেচ্ছাসেবীদের সহায়তায় তাঁদের পরিজনদের খুঁজে পেতে সমর্থ হয়েছে। ১১২ জনকে বিভিন্ন অপরাধমূলক জনিত কারণে গ্রেফতার করা হয়েছে।

