অবমাননায় শাস্তি! জাতীয় সঙ্গীতের মর্যাদা পাচ্ছে ‘বন্দে মাতরম’
রাজন্যা নিউজ, নয়াদিল্লি ‘বন্দে মাতরম’কে জাতীয় সঙ্গীতের মর্যাদা দেওয়ার পথে কেন্দ্র। সেই লক্ষ্যেই নাকি প্রস্তুতি শুরু করেছে কেন্দ্রীয় সরকার। জাতীয় সঙ্গীত ‘জনগণমন’-এর মতোই ‘বন্দে মাতরম’ গাওয়ার নিয়ম, আচরণবিধি ও আইনি দায়বদ্ধতা থাকবে কি না, তা নিয়ে সম্প্রতি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক হয়েছে বলে খবর। জানা গিয়েছে, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের ডাকা ওই বৈঠকে জাতীয় সঙ্গীতের মতো জাতীয় গানের ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট প্রোটোকল থাকা উচিত কি না, তা খতিয়ে দেখা হয়েছে।
এর ফলে ফের একবার সামনে এল বিজেপির গোপন অ্যাজেন্ডা। কারণ বহুদিন থেকেই আরএসএস চাইছে জাতীয় সংগীত জনগণমনকে সরিয়ে তার জায়গায় রাষ্ট্রীয় স্তোত্র বন্দেমাতরমকে আনতে। সংঘের সেই গোপন পরিকল্পনা বাস্তবায়িত করার কাজ চালাচ্ছে কেন্দ্রের নরেন্দ্র মোদি সরকার। মোদি সরকার মনে করে, জাতীয় সংগীত জনগণমন এবং রাষ্ট্রীয় স্তোত্র বন্দেমাতরম দুইয়েরই মর্যাদা সমান। তাই জাতীয় সংগীত ও জাতীয় স্তোত্রর সমান সম্মান পাওয়া উচিত। দেশের নাগরিকদের দু’টি গানকেই সমানরকম সম্মান ও মর্যাদা দেওয়া উচিত।
বিজেপির বক্তব্য, ‘বন্দে মাতরম’-এর প্রতি সম্মান আরও বাড়াতেই এই উদ্যোগ। দলের অভিযোগ, ১৯৩৭ সালে কংগ্রেস এই গানের কিছু গুরুত্বপূর্ণ অংশ বাদ দিয়ে তার গুরুত্ব খাটো করেছিল। সেই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের কথাও নতুন করে সামনে আনছে শাসক দল।
এই আলোচনার সময়টাও তাৎপর্যপূর্ণ। কেন্দ্রীয় সরকার বর্তমানে ‘বন্দে মাতরম’-কে ঘিরে বছরব্যাপী এক কর্মসূচি পালন করছে। সেই উদযাপনের প্রথম পর্ব শেষ হয়েছে গত নভেম্বর মাসে। দ্বিতীয় পর্ব চলছে এই মাসে। তৃতীয় পর্ব নির্ধারিত হয়েছে ২০২৬ সালের অগস্টে এবং চতুর্থ তথা শেষ পর্ব হবে ২০২৬ সালের নভেম্বর মাসে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের বৈঠকে জাতীয় গানের ব্যবহারিক দিকগুলি নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে। কোন কোন অনুষ্ঠানে ‘বন্দে মাতরম’ গাওয়া হবে, জাতীয় সঙ্গীতের সঙ্গে একসঙ্গে গাওয়া উচিত কি না, অথবা আলাদা সময় নির্ধারণ করা হবে কি না, এই সমস্ত প্রশ্ন উঠে এসেছে। পাশাপাশি, জাতীয় গানের অবমাননা হলে কোনও শাস্তিমূলক বিধান থাকা উচিত কি না, সে বিষয়েও মতামত বিনিময় হয়েছে।
প্রসঙ্গত, সাম্প্রতিক বছরগুলিতে জাতীয় সঙ্গীত ও জাতীয় প্রতীকের মর্যাদা সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে একাধিক মামলা আদালতে হয়েছে। জাতীয় সঙ্গীত গাওয়ার নিয়মাবলি কী হবে, অথবা জাতীয় সম্মান অবমাননা প্রতিরোধ আইন, ১৯৭১-এর আওতায় শাস্তির বিধান প্রযোজ্য কি না, এই প্রশ্নগুলিও বারবার উঠে এসেছে। সেই আইন মূলত জাতীয় প্রতীক ও জাতীয় সঙ্গীতের অবমাননা রুখতেই প্রণয়ন করা হয়েছিল।
বন্দে মাতরম। একটা জাতির জীবনীশক্তি। ভারত স্বাধীনতার বহু বছর আগে থেকেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জনগণমন অধিনায়ক গানের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে লড়াই করেছে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের এই মাতৃ বন্দনাগীতি। বন্দে মাতরম এই দেশের পরাধীনতা থেকে মুক্তির লড়াইয়ের একমাত্র ধ্বনি, যা কালাপানি পারের কুখ্যাত সেলুলার জেলের নৃশংস অত্যাচার সহ্য করতেও সঞ্জীবনী বটিকার মতো কাজ করত। একটি স্তোত্র বা বন্দনাগান যার আয়ুষ্কাল ১৫০ বছর। জানা নেই, পৃথিবীর আর কোনও দেশে এমন দৃষ্টান্ত আছে। কমিউনিজমের পতনের পর লং লিভ রেভ্যুলেশনও হার মেনেছে বঙ্কিমচন্দ্রের বন্দে মাতরমের কাছে।
১৮৭৫-এ যখন ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকায় প্রথম ‘বন্দে মাতরম’ গানটি ‘পাদপূরণ’ হিসেবে প্রকাশিত হয় তখন এই ব্যাপারে তেমন ব্যাপক প্রচার হয়নি। অর্থাৎ পত্রিকার একটি পাতা ভরাট করার জন্য লেখা হয়েছিল বন্দনাগীতিটি। কারও নজরেও পড়েনি তেমন করে। বঙ্কিমচন্দ্র ১৮৮২ সালে ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাসে ‘বন্দে মাতরম’ সংযুক্ত করেন, তখন থেকেই এর উত্থান ও বিতর্কের সূত্রপাত।

