কৃষিও চলবে, শিল্পও চলবে সিঙ্গুর থেকে বার্তা মমতার

কল্যাণ অধিকারী, রাজন্যা নিউজ

সিঙ্গুরের ‘পুণ্য ভূমি’ ছুঁয়েই শুরু হল মমতার বিধানসভা ভোটের লড়াই। বুধের দুপুরে সিঙ্গুরের মঞ্চে দাঁড়িয়ে একের পর এক ইস্যুতে বিজেপিকে তুলোধনা করেন মুখ্যমন্ত্রী। এসআইআর নিয়ে কেন্দ্র–কমিশনের ‘চক্রান্ত’, ভিন রাজ্যে বাঙালিদের উপর হামলা, প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে ‘মহিলা বিরোধী’ বলে কটাক্ষ। এখানেই শেষ নয় ‘তারকেশ্বর-বিষ্ণুপুর লাইন তিনি করেছেন, কেন্দ্রীয় সরকার ফিতে কেটেছে এটাও স্মরণ করালেন। বিজেপিকে হুশিয়ারি দিয়ে বলেন, ‘জেলে ভরো, গুলি করো—আই ডোন্ট কেয়ার! আমি সব কিছুর জন্য তৈরি। মমতার মুখে এসব শুনে তুমুল হাততালি দিলেন বেড়াবেড়ি অঞ্চল, কেজিডি, গোপালনগর ও বারুইপাড়া পলতাগড় অঞ্চল থেকে আগত হাজারও মানুষজন, তৃণমূল নেতৃত্ব ও কর্মীবৃন্দ।

সিঙ্গুর নিয়ে তিনি অনেককিছু করেছেন বলেও জানালেন। মমতা বলেন, সিঙ্গুরে ৮ একর জমির ওপর ৯ কোটি ২০ লক্ষ টাকা খরচ করে, সেখানে সিঙ্গুর অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক গড়ে তোলা হয়েছে। ২৮টি প্লটের মধ্যে বরাদ্দ হয়ে গিয়েছে ২৫টি। অনেক মানুষের কর্মসংস্থান হবে। কৃষিজমি দখল করে নয়, কৃষি-শিল্প পাশাপাশি চলবে। ৭৭ একর জমিতে প্রাইভেট ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক সিঙ্গুরে হচ্ছে। অ্যামাজন, ফ্লিপকার্টের বড় ওয়্যার হাউজ হবে। যেখানে হাজার হাজার লোকের কর্মসংস্থান হবে। এরপরেই বিরোধী দলের নেতাদের নিশানা করে বলেন, এখানে এসে একটা ইটও পোঁতেননি, শুধু কুৎসা করেছেন। এরপর কেন্দ্রের শাসকদল বিজেপি ও জাতীয় নির্বাচন কমিশনকে কার্যত চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেন। বিজেপি যতই কমিশনকে নিয়ে চেষ্টা করুক বিজেপিকে বাংলা জয় করতে দেবেন না। আর এসআইআরের মাধ্যমে রাজ্য থেকে ভোটারদের নাম বাদ দেওয়ার কমিশনের চক্রান্তকেও ভালো চোখে দেখছেন না মুখ্যমন্ত্রী। বিজেপি ও নির্বাচন কমিশনকে একি আসনে বসিয়ে এদিন সিঙ্গুরের মাটি থেকেই হুঁশিয়ারি দিয়ে রাখলেন মমতা।

ভোটের আগে বড় মাস্টার স্ট্রোক দিয়ে সিঙ্গুর থেকে ঘাটাল মাস্টার প্ল্যানের উদ্বোধন করেন মুখ্যমন্ত্রী। একি মঞ্চে মমতার পাশেই তখন দাঁড়িয়ে ঘাটালের সাংসদ দেব। মুখ্যমন্ত্রী জানান, ঘাটাল মাস্টার প্ল্যান ঘাটালবাসীর দীর্ঘ দিনের দাবি হলেও কেন্দ্রীয় বঞ্চনার কারণেই এতদিন প্রকল্প আলোর মুখ দেখেনি। তাঁর ঘোষণা, কেন্দ্রের সাহায্য ছাড়াই রাজ্য সরকার নিজেদের ফান্ড থেকে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। প্রাথমিকভাবে ১৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে এবং ২০২৭ সালের মার্চ মাসের মধ্যে প্রকল্প শেষ করার সময় ধার্য করা হয়েছে। দেব ছাড়াও মঞ্চে ছিলেন ঘাটালের তিন বারের সাংসদ-অভিনেতা দেব, জলসম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রী মানস ভুঁইঞা, সাংসদ-অভিনেত্রী রচনা বন্দ্যোপাধ্যায়। ঘাটাল মাস্টার প্ল্যানের পাশাপাশি বাংলার বাড়ি প্রকল্পের মোট ৩২ লক্ষ উপভোক্তার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে টাকাও পাঠান তিনি। বিজেপিকে দিদির মতোই নিশানা করেছেন উপস্থিত তৃণমূল কর্মীরা। হাতে রাখা বোর্ডে লেখা, ছাব্বিশে আমাদের নয়, তোমাদের পতন হবে। তৃণমূলের একাংশের দাবি, উন্নয়নের মোড়কে দিদি রাজ্যকে সাজাচ্ছে। এরপর বিজেপি কোন মুখে ভোট চাইবে।

মহারাষ্ট্রের উপমুখ্যমন্ত্রী অজিত পওয়ারের মৃত্যুর কারণে আপাতত দিল্ল সফর স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন মমতা। এদিন মঞ্চ থেকে বলেন, ‘আজ নয়, কাল যাবই। আপনারা মানুষের অধিকার কাড়বেন। হতে দেব না। দরকারে আমি কোর্টে যাব। আমাদের এক বিধায়ক বলছিল, মুসলিম বলে ডেকে পাঠিয়েছে। শশীকে ডেকেছে। জয় গোস্বামীকে ডেকেছে। লুটেরাদের পার্টি, ঝুটেরাদের পার্টি। ছেড়ে দেব না। চলবে না অন্যায়। অপেক্ষা কর। বাংলার মেয়েরা বিয়ে করে শ্বশুরবাড়ি যায়। পদবি পালটে যায়। তাই বলে এসআইআরে ডাকবে। আমাকে জেলে ভর, গুলি কর, আই ডোন্ট কেয়ার। আমাকে জেলে দিলে মা-বোনেরা জবাব দেবে। কৃষকরা জবাব দেবে। একই সঙ্গে এসআইআর ইস্যুতে মানুষকে আতঙ্কিত না হওয়ার বার্তা দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “চিন্তা করে শরীর খারাপ করবেন না। আত্মহত্যা করবেন না। এটা বাংলা। ডাকছে ডাকুক— যাবেন। এখানে ডিটেনশন ক্যাম্প হবে না। ওরা ঔদ্ধত্য দেখাচ্ছে। অহঙ্কার দেখাচ্ছে। সব অহঙ্কার ভেঙে চূর্ণবিচূর্ণ করব। শুধু আপনারা পাশে থাকুন।

বুধবার রতনপুরের ইন্দ্রখালির মাঠে সভা থেকে বাংলা ভাষাকে ধ্রুপদী ভাষার মর্যাদা না দেওয়ার অভিযোগে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকেও তীব্র কটাক্ষ করেন মমতা। তাঁর মন্তব্য, সব ঝুট হ্যায়। পাঁচ বস্তা বই পাঠিয়েছিলাম দিল্লিতে। বাংলার জন্য রিসার্চ টিম তৈরি করেছিলাম। তবু বাংলাকে ধ্রুপদী ভাষার মর্যাদা দেননি। আপনারা বাংলায় কথা বললে মানুষকে মারেন। এরপর তিনি শিল্প নিয়ে জানান, কৃষিজমি দখল নয়, কৃষির সঙ্গে সহাবস্থান করেই শিল্প, এই নীতিতেই এগোচ্ছে রাজ্য সরকার। অর্থাৎ কৃষিও চলবে, শিল্পও চলবে! আমি মরে যাব, কিন্তু আমার কথার দাম আছে। কথা দিলে ১০০ শতাংশ রাখি। ডাবল ইঞ্জিন সরকারের মতো জুমলা করি না। আমাদের সরকার মানুষের সরকার। একি সঙ্গে নিজের জমি আন্দোলনের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, “সিঙ্গুরের জমি ফিরিয়ে না দিলে আমি নিজেকে বাজি রেখেছিলাম। মরার জন্য তৈরি ছিলাম। কথা দিয়েছিলাম, কথা রেখেছি। জমি ফিরিয়ে দিয়েছি।” এরপরই মোদীকে নিশানা করে বলেন, “তোমরা কী করেছো,শুধু মুখে বড় বড় বুলি? তারকেশ্বর-বিষ্ণুপুর লাইন, আমি করে গিয়েছিলাম আর ওরা ফিতে কেটেছে। এর বেশি কিছু নয়। এই বুলি চলবে না বাংলায়।” প্রসঙ্গত ১৮ তারিখ প্রধানমন্ত্রী এই সিঙ্গুরের সভা থেকেই রেলের ওই প্রকল্পের উদ্বোধন করেছিলেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *