সাবেক মাও ‘ঘাঁটি’ জঙ্গলমহল ভোট দিল শান্তিতে
কল্যাণ অধিকারী, এডিটর রাজন্যা নিউজ
ঘড়িতে তখন বেলা দশটা খড়গপুর ছেড়ে ট্রেন ঝাড়গ্রামমুখি। জনা কুড়ি যাত্রী ব্যাগ ভর্তি পোশাক ও কিছু ফল নিয়ে ফিরছে লালগড়ের দলিলপুর ও আশপাশের গ্রামে। ঝাড়গ্রাম শহর থেকে প্রায় ৪০ কিমি দূরে সাবেক মাওবাদী ঘাঁটি জঙ্গলমহলে ওঁদের বাড়ি। আগের মতো গ্রামে আর থাকে না। অনেকেই এখন চেন্নাই চলে গেছে। ওখানেই ফ্যাক্টরিতে কাজ করে। বাড়িতে যাবার আগে ভোট দেব তারপর ঘরে ঢুকব। কথার মাঝেই ট্রেন সরডিহা, বাঁশতলা পার করে এগোচ্ছে। পরের স্টেশন ঝাড়গ্রাম। লাইন ধারে ক’টা পুরনো কামরা আজও মাও হামলার স্মৃতি উসকে দিল। ব্যাস ওটুকুই।
ঝাড়গ্রাম থেকে গাড়ি যতই এগিয়েছে জঙ্গল অভিমুখে, ততই নজর পড়ছে শান্ত পরিবেশ। তবে বাহিনীর গাড়ি ও কমিশনের ক্যামেরা লাগানো গাড়ি ঘোরাঘুরি করছে। ঝাড়গ্রাম জেলার চারটি বিধানসভার ১৩০০-র বেশি বুথ। সাঁওতাল, মুন্ডা, ভূমিজ, কুড়মি, মাহাতো এবং লোধা সম্প্রদায়ের মতো আদিম অধিবাসীদের বাস। চালক বললেন, ভোটের এক সপ্তাহ আগে থেকেই এলাকায় বাহিনী টহল দিচ্ছে। আজ তো হাতে গোনা গাড়ি চলাচল করছে। এখন লালগড় যেতে অনেকেই ধেড়ুয়া হয়ে যায়। আমাদের গাড়ি বেলাটিকরির দিকে যাওয়ার আগে এলাকার একটি স্কুলে বুথ দেখে দাঁড়াল। বন্দুকধারীরা বুথের সুরক্ষা দিচ্ছিল। মানুষের ভোট দেওয়ার লাইন। বাহিনীর লোকজন কাগজপত্র দেখে ভোটারদের বুথে ঢুকতে দিচ্ছে। হিন্দিতে জওয়ান জানালেন, ‘ভোটার ছাড়া কেউ ঘেঁসছে না। ভোটের কোন গন্ডগোল হচ্ছে না। শান্তিতে ভোট হচ্ছে’।
ঝাড়গ্রাম নতুন জেলা হওয়ার পর থেকেই উন্নয়ন হচ্ছে। রাস্তাঘাট, চিকিৎসা, সেতু সবই করেছে সরকার, জানালেন এলাকার বাসিন্দা বিস্টু সোরেন। অনেকেই বলছেন, শাসকের একার আধিপত্য অনেকটাই ফিকে হয়েছে। বিজেপির জোরালো প্রভাবের ফলে এক দশকে শাসকের আধিপত্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। দিল্লি থেকে এসে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সভা করে গিয়েছেন। তিনি গাড়ি থামিয়ে বিহারি বাবুর কাছ থেকে ঝালমুড়ি খেয়ে ভাইরাল করে দিয়েছেন। এখান থেকে এগিয়ে যান, জঙ্গলের ভিতর দিয়ে যেতে যেতে দেখবেন, চন্দ্রপুর মোড় থেকে লালগড় পর্যন্ত রাস্তাটি প্রায় ৭ মিটার চওড়া। আর চন্দ্রপুর মোড় থেকে দহিজুড়ি পর্যন্ত রাস্তাটি সাড়ে পাঁচ মিটার চওড়া। লালগড়ের বাসিন্দারা, এখন অনেকটা ক্লম সময়ে পৌঁছে যাচ্ছেন ঝাড়গ্রাম।
ভোটের দিনও কান পাতলে শোনা যায় মাওবাদীদের আগেকার অবস্থানের কথা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যক্তির কথায়, এক সময় লালগড় থেকেই গোটা জঙ্গলমহলে অশান্তি ছড়িয়েছিল। অনেকে বললেও সিঙ্গুর, নন্দীগ্রাম, ছাড়াও রাজ্যে পালাবদলের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অনুঘটকের কাজ করেছিল লালগড়ের আন্দোলন। একদিকে ঝাড়গ্রাম অন্যদিকে ঝাড়খণ্ড এবং ওড়িশা সীমানা হওয়ায় বাহিনীর নজরদারি এবার ঝাড়গ্রাম, লালগড়, বেলপাহাড়ি এলাকায় অনেকটাই বেশি ছিল। তবে মোটের উপর শান্তিতেই ভোট উৎসবে সামিল হয়েছিলেন মানুষজন।

