ইডি-দিদি মামলা,ক্যাভিয়েট রাজ্যের সিবিআই চেয়ে শীর্ষ কোর্টে ইডি
রাজন্যা নিউজ ব্যুরো, নয়াদিল্লি: আদালত কক্ষে তুমুল হইচই, উপচে পড়া ভিড়ের মাঝে স্থগিত হয়ে যায় তৃণমূল বনাম ইডি মামলা। দ্রুত শুনানির আর্জি জানিয়ে শুক্রবার হাইকোর্টের ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতিকে একটি মেইলও করে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট। সেই আবেদন গ্রাহ্য হয়নি। এই পরিস্থিতিতে ইডি শীর্ষ আদালতের দ্বারস্থ হয়েছে। তার আগেই সুপ্রিম কোর্টে ক্যাভিয়েট দাখিল করা হয়েছে রাজ্যের তরফে।
ইডি যদি আগেভাগে সুপ্রিম কোর্টে যায়, সেই কারণেই রাজ্য এই ক্যাভিয়েট দাখিল করেছে বলে জানা যাচ্ছে। ক্যাভিয়েট দাখিল করার অর্থ হল, যাতে প্রতিপক্ষ কোনও সুবিধা না নেয়, অবগত না করে যাতে কোনও আইনি পদক্ষেপ করা না হয়।
সুপ্রিম কোর্টে রাজ্যের ক্যাভিয়েট দখলের এই পদক্ষেপে বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য কটাক্ষ করে বলেন, ‘সুপ্রিম কোর্টের দরজা খোলা আছে। এতে নতুন কিছু নেই। তাঁর (মুখ্যমন্ত্রীর) যদি মনে হয় বিজেপি রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করছে। তাহলে তিনি সুপ্রিম কোর্টে যান।’
গত ৮ জানুয়ারি তৃণমূলের পরামর্শদাতা সংস্থা আইপ্যাকের ডিরেক্টর প্রতীক জৈনের লাউডন স্ট্রিটের বাড়ি ও সংস্থার সল্টলেকের দফতরে তল্লাশি অভিযান চালায় ইডি। কয়লা পাচার মামলায় আর্থিক তছরুপের তদন্তে পশ্চিমবঙ্গের ছ’টি ও দিল্লির চারটি জায়গায় এই তল্লাশি চলছিল। এই কয়লা পাচারের কালো টাকা হাওয়ালার মাধ্যমে প্রতীক জৈনের আইপ্যাকে বিনিয়োগ করা হয়েছিল বলে দাবি ইডির। সেই প্রমাণের ভিত্তিতে তাঁর বাড়ি এবং আইপ্যাকের দফতরে তল্লাশি চালানো হচ্ছিল বলে জানায় কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা।
বৃহস্পতিবার তল্লাশির মধ্যে সকাল ১১টা নাগাদ মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিশাল পুলিশ বাহিনী নিয়ে প্রথমে প্রতীক জৈনের বাড়িতে পৌঁছান। ইডির তল্লাশি চলাকালীন তিনি সেখান থেকে একটি সবুজ ফাইল, ল্যাপটপ এবং হার্ডডিস্ক নিয়ে বেরিয়ে আসেন এবং সাংবাদিকদের দেখান। সেই সময় সেখানে ছিলেন কলকাতার পুলিশ কমিশনার মনোজ ভার্মা এবং অন্য পুলিশ কর্তারা।
এরপর মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পৌঁছন সল্টলেকে আইপ্যাকের দফতরে। সেখানেও ইডির তল্লাশি চলাকালীন তিনি বেশ কিছু ফাইল, হার্ডডিস্ক ও নথি বের করে নিয়ে এসে তাঁর গাড়িতে তোলেন। মুখ্যমন্ত্রীর অভিযোগ, আসন্ন বিধানসভা ভোটে তৃণমূলের নির্বাচনী কৌশল হাতিয়ে নিতে চায় ইডি। তারা কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের হয়ে কাজ করছে। দলের গোপন ও গুরুত্বপূর্ণ নথি করায়ত্ত করতে এই তল্লাশি চালাচ্ছিল ইডি। মুখ্যমন্ত্রীর এই ফাইল, ল্যাপটপ, হার্ডডিস্ক নিয়ে আসার ঘটনায় বিতর্ক তৈরি হয়।
এই তল্লাশি নিয়ে সেদিনই ইডি একটি বিবৃতি জারি করে জানায়, ‘কয়লা মাফিয়া অনুপ মাজির নেতৃত্বে কয়লা চুরির মামলায় পশ্চিমবঙ্গের ৬টি এবং দিল্লির ৪টি জায়গায় তল্লাশি অভিযান চালাচ্ছিল ইডি। অনুপ মাজি বেআইনি উপায়ে ইসিএল-এর লিজ নেওয়া এলাকাগুলি থেকে কয়লা তুলতেন। এই মামলায় শান্তিপূর্ণভাবে তল্লাশি অভিযান চলছিল। সেখানে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এসে পৌঁছন। তিনি এবং তাঁর সঙ্গে থাকা পুলিশ কর্তা ও সরকারের উচ্চাধিকারিকরা দু’টি জায়গায় পৌঁছন এবং জবরদস্তি বেশ কিছু নথি এবং ইলেক্ট্রনিক নথি সরিয়ে নিয়ে যান।’
কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা পরিষ্কার জানায়, ‘প্রমাণ হাতে পেয়ে সেই ভিত্তিতে এই তল্লাশি অভিযান চলছিল। এর সঙ্গে রাজনীতির কোনও সম্পর্ক নেই। কোনও পার্টি অফিসে তল্লাশি হয়নি। নির্বাচনের সঙ্গে এর কোনও যোগ নেই। আর্থিক প্রতারণার মামলায় এটা নিয়মমাফিক তল্লাশি। আইনি রক্ষাকবচ নিয়ে এই তল্লাশি অভিযান চলছিল।’
ওইদিন বিকেলে ইডি রাজ্যের বিরুদ্ধে তদন্তে বাধা দেওয়ার অভিযোগ তুলে কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি শুভ্রা ঘোষের বেঞ্চে শুনানির আবেদন জানায়। এরপর আইপ্যাকের কর্ণধার প্রতীক জৈনের তরফেও দু’টি মামলা দায়ের হয় ওই এক বেঞ্চে। একটি মামলা করেন প্রতীক। আরেকটি মামলা হয় তাঁর পরিবারের তরফে।
আদালতে আবেদনে আইপ্যাক ইডি তল্লাশিতে স্থগিতাদেশ চায়। পরদিন অর্থাৎ ৯ জানুয়ারি দুপুর ২.৩০ টার সময় বিচারপতি শুভ্রা ঘোষের বেঞ্চে মামলার শুনানি শুরু হয়। হাইভোল্টেজ মামলার শুনানিতে প্রচণ্ড ভিড় হয় তাঁর এজলাসে। সঙ্গে চলতে থাকে হইহট্টগোল। বিচারপতি মামলায় যুক্ত আইনজীবী ছাড়া বাকিদের বাইরে বেরিয়ে যেতে নির্দেশ দেন। কিন্তু তাতেও শোরগোল থামেনি। তখন তিনি উঠে যান এবং আগামী ১৪ জানুয়ারি মামলার পরবর্তী দিন ধার্য করেন।
এই অবস্থায় জরুরি ভিত্তিতে শুনানির আবেদন জানিয়ে কলকাতা হাইকোর্টের ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি সুজয় পালের দ্বারস্থ হয় ইডি। তিনি এই মামলায় হস্তক্ষেপ করবেন না বলে মৌখিকভাবে জানিয়ে দেন এবং বিচারপতি শুভ্রা ঘোষের ১৪ জানুয়ারি মামলার শুনানির দিন বহাল রাখেন। এই অবস্থায় ইডি আইপ্যাকে ইডি তল্লাশির ঘটনায় রাজ্যের বিরুদ্ধে সিবিআই তদন্ত চেয়ে সুপ্রিম কোর্টে মামলা দায়ের করল। এই সম্ভাবনা আগে থাকতে আঁচ করে রাজ্যও দেশের শীর্ষ আদালতে ক্যাভিয়েট দাখিল করেছে।
ইডি এই ঘটনায় রাজ্যের বিরুদ্ধে সিবিআই তদন্তের আবেদন জানিয়েছে। কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার আবেদন, সিবিআই এফআইআর দায়ের করে তদন্ত শুরু করুক। সেই নির্দেশ দিক আদালত। ইডির থেকে ছিনিয়ে নেওয়া বাজেয়াপ্ত নথি ও ডিজিটাল ডিভাইস এবং সংবাদমাধ্যমের ভিডিয়ো বাজেয়াপ্ত করে ফরেনসিকে পাঠানো হোক। ইডির তল্লাশির কাজে বাধা দেওয়া অসাংবিধানিক। ইডির হাত থেকে হাতিয়ে নেওয়া নথি হস্তান্তরের নির্দেশ দিক আদালত। সিসি ফুটেজ আদালতে জমা দেওয়ার নির্দেশ দিক আদালত।

