কেউ কথা রাখেনি, বিলীন হবে মালদা, মুর্শিদাবাদ! গঙ্গা গিলেছে ৪১৩ গ্রাম

রাজন্যা নিউজ ব্যুরো মুর্শিদাবাদ

আগ্রাসী গঙ্গা, পদ্মা ও ভাগীরথী নদীর ভাঙনের জেরে ভারতীয় ভূখণ্ডের মানচিত্র থেকে মুছে যেতে বসেছে মুর্শিদাবাদের ফারাক্কা, সামসেরগঞ্জ, সুতি, লালগোলা’সহ জেলার বিস্তীর্ণ এলাকার বহু গ্রাম। ২০১৪ আগে গঙ্গা ভাঙন দেখা গিয়েছিল বেশ কয়েকটি এলাকায়। কিন্তু ২০২০ সালে ভয়াবহ গঙ্গা ভাঙনের শিকার হয় মুর্শিদাবাদের সামশেরগঞ্জের ধানঘড়া গ্রাম। ১৫ আগস্ট স্বাধীনতা দিবসের ঠিক একদিন আগেই সামশেরগঞ্জের ধানঘড়া গ্রামে মধ্যরাতে শুরু হয় ভয়াবহ গঙ্গা ভাঙন। গঙ্গা ভাঙনের এতটাই প্রকট আকার ধারণ করে যে গ্রামের একাংশ গিলে খায় গঙ্গা। আগ্রাসী গঙ্গার দাপটে গ্রাম জুড়ে শুরু হয় হাহাকার আর্তনাদ, গ্রামের ১০০টি পরিবারের মধ্যে ৬০ থেকে ৭০টি পরিবারের বাড়িঘর চলে যায় গঙ্গায়। ধানগড়া গ্রামে যখন গঙ্গা ভাঙন নিয়ে যখন হূলস্থূল চলছে পাশের আরও একটি গ্রামে ভয়াবহ গঙ্গা ভাঙনের কবলে পড়ে।
সামশেরগঞ্জের নিমতিতা গ্রাম পঞ্চায়েতের ধুসুড়িপাড়া, দুর্গাপুর, কামালপুর, শিবনগর, চাচন্ড গ্রাম পঞ্চায়েতের নতুন শিবপুর, প্রতাপগঞ্জ অঞ্চলের প্রতাপগঞ্জ, মহেশটলা, বোগদাদনগর পঞ্চায়েতের বোগদাদনগর তিন পাকুরিয়া, চাচন্ড, লালপুর, ঘনশামপুর, ফুলতলা’সহ একাধিক গ্রাম গঙ্গা গর্ভে চলে গিয়েছে। বাড়ি ঘর জমি জায়গা, বসৎ ভিটে মাটি, আম বাগান লিচুবাগান সহ চাষযোগ্য জমি গ্রাস করেছে গঙ্গা। মন্দির, মসজিদ, শিশু শিক্ষা কেন্দ্র, অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্র’সহ বিভিন্ন সরকারি স্থাপনা গঙ্গা গিলে নিয়েছে। ২০২০ থেকে ২০২৫ পর্যন্ত মুর্শিদাবাদের সামশেরগঞ্জের ১৪ থেকে ১৫টি গ্রাম গ্রাস করেছে গঙ্গা। জমি জায়গা ভিটে মাটি সর্বস্ব হারিয়ে আজ কেউ গাছ তলায় বাস করছে তো কেউ অন্যের বারান্দায় বসবাস করছেন। ভিটেমাটি জমি জায়গা হারিয়ে অধিকাংশ মানুষ সর্বস্ব হারিয়ে বিপাকেও পড়েছেন।
ঠিক একই অবস্থায় মুর্শিদাবাদের আরও একটি ব্লক লালগোলার বাসিন্দাদের। গত দু’মাস ধরে টানা লালগোলার তারানগর গ্রামে তাণ্ডব চালাচ্ছে পদ্মা। পদ্মার ভাঙনে লালগোলার তারানগর গ্রাম আজ নদীতে পরিণত হয়েছে। গঙ্গা গ্রাস করেছে গ্রামের একমাত্র শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তারানগর প্রাইমারি ßুñলটিকেও। গ্রামের ৮০ শতাংশ ওই বাড়িঘর জমি জায়গা গিলে খেয়েছে পদ্মা। ভাঙন, প্লাবন’সহ নানা আতঙ্কে এই বরাবরই আতঙ্কিত হয়ে থাকে মুর্শিদাবাদের একা একের পর এক বিভিন্ন ব্লকের বাসিন্দারা।
নদীভবন এবং মুর্শিদাবাদ বাসীর কাছে যেন আশীর্বাদে পরিণত হয় হয়েছে। কখনও জলঙ্গিতে পদ্মা ভাঙন, তো কখনও ফারাক্কায় গঙ্গা ভাঙন, কখনও সুতিতে ভাগীরথী নদীতে ভাঙন, কখনও সুতি সামশেরগঞ্জ ফরাক্কা’সহ রঘুনাথগঞ্জে বিস্তীর্ণ এলাকায় গঙ্গা ভাঙ্গন অন্যদিকে প্লাবন।
ভারতীয় ভূখণ্ড থেকে যখন মুর্শিদাবাদ জেলার একাংশ গঙ্গা গ্রাসের জেরে বিলীন হতে বসেছে। তারপরেও কোনরকম হেলদোল দেখা যায়নি না রাজ্য সরকারের না কেন্দ্র সরকারের। ভোট আছে ভোট চাই রাজনৈতিক কারবারিরা! নদী ভাঙন কপালিত এলাকার মানুষদের শুধু কথা দেন! কিন্তু আজ পর্যন্ত কেউই কথা রাখেনি। ২০০৪ সালের আগে মুর্শিদাবাদে গঙ্গা পদ্মা ভাঙনের ভয়াবহ আকার নেই পদ্মা ভাঙন। ভগবানগোলা ব্লকের আখেরিগঞ্জ এলাকায় ভয়াবহ ভয়াবহ পদ্মা ভাঙনের জেরে আখরীগঞ্জের একাংশ বিলীন হয়ে যায়। লালগোলা রঘুনাথগঞ্জ সুতির একাংশ ও ধুলিয়ান শহরের একাংশজুড়ে ভয়াবহ গঙ্গা পদ্মা ভাঙনের শিকার হয় স্থানীয় এলাকার মানুষেরা। গঙ্গা ভাঙনকে জাতীয় সমস্যায়ে রূপান্তরিত করার দাবি তোলা হয় রাজনৈতিক দলগুলির তরফ থেকে। ২০০৪ সালে জঙ্গিপুর লোকসভার সাংসদ হন প্রয়াত ও রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়। প্রণব মুখোপাধ্যায় জঙ্গিপুর লোকসভা কেন্দ্রের সাংসদ হওয়ার পর একদিকে জলঙ্গি অন্যদিকে ভগবানগোলার আখরীগঞ্জ ও সুতির বিস্তীর্ণ এলাকায়জুড়ে গঙ্গা ভাঙন প্রতিরোধের জন্য ১০০ কোটি টাকা কেন্দ্রের বরাদ্দ করে দেন। ১০০ কোটি পদ্মা ও গঙ্গা ভাঙন রোধে বরাদ্দ হাওয়াই পাথর দিয়ে ইস্পাত তৈরি করে ভাঙন রোধের কাজ সম্পূর্ণ করা হয়। তারপর থেকে ভগবানগোলা, সুতি, জলঙ্গীর বিস্তীর্ণ এলাকায় ভাঙন সমস্যার সমাধান হয়।
সূত্রের খবর, ১৯৭২ সালে ভয়াবহ পদ্মা এবং গঙ্গা ভাঙনে শিকার হয়েছিল মুর্শিদাবাদের সুতি, রঘুনাথগঞ্জ, লালগোলা, ভগবানগোলা, জলঙ্গি’সহ মুর্শিদাবাদ জেলার বিভিন্ন ব্লকের বাসিন্দারা। ১৯৭২, ১৯৮৬, ২০০০ সাল ২০০৬ ২০১৪, গঙ্গা পদ্মা ভাগিরথীর ভাঙন চরম আকার ধারণ করলেও ২০২০ এর গঙ্গা ও পদ্মা ভাঙন মতো ভয়াবহ আকার ধারণ করেনি।
গঙ্গা ভাঙন রোধের জন্য ফরাক্কা ব্যারেজ কর্তৃপক্ষ ৩০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে সমস্ত রকম কাজকর্ম দেখভাল করার দায়িত্ব তাদের থাকলেও তারাও কোনরকম গঙ্গাভাবনা রোধ বা নদী ভাঙন কবলিত এলাকার মানুষদের জন্য কোন ভাবনায় দেখা যায়নি।
ক্ষয়ক্ষতির বিবরণ: ২০২০ সালে মুর্শিদাবাদের ধানঘরা গ্রামে গঙ্গা ভাঙন শুরু হয়, যা ব্যাপক আতঙ্কের সৃষ্টি করে। বহু মানুষের ঘরবাড়ি, চাষের জমি এবং আমের বাগান গঙ্গার গ্রাসে বিলীন হয়ে যায়। মধ্যরাতে ভাঙন শুরু হওয়ায় বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং তারা আসবাবপত্র নিয়ে দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে এলাকা ছাড়তে বাধ্য হন।
দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব: এই ভাঙন শুধু ২০২০ সালেই ঘটেনি, বরং এটি মালদা ও মুর্শিদাবাদ জেলায় একটি দীর্ঘস্থায়ী সমস্যায় পরিণত হয়েছে।
২০১৪ সাল থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত, দুই জেলায় প্রায় ৪৫,৩৪৩ বিঘা জমি এবং ৪১৩টি গ্রাম গঙ্গা ভাঙনের শিকার হয়েছে।
পরবর্তী ঘটনা: ২০২০ সালের পর, বিশেষ করে ২০২১, ২০২২ এবং ২০২৩,২০২৪,২০২৫ সালে গঙ্গার জলস্তর বৃদ্ধি পাওয়ায় এই ভাঙন আবারও তীব্র আকার ধারণ করে, যা স্থানীয় বাসিন্দাদের জীবনকে আরও অনিশ্চিত করে তোলে। ২০২০ সালে শুরু হওয়া ভাঙন পরবর্তী বছরগুলোতে আরও ভয়াবহ রূপ ধারণ করে।
সামসেরগঞ্জের ধানঘরা গ্রামের বাসিন্দা আনোয়ারা বিবি বলেন, বাড়িঘর জমি জায়গা সবকিছু চলে গেছে গঙ্গায়। সরকারি এক শতক জায়গার ওপরে কোনরকম বসতভিটে করে বসবাস করছি চার ছেলেমেয়ে নিয়ে। জমি ছিল, জায়গা ছিল, বাড়িঘর ছিল, লিচুবাগান ছিল, সবকিছুই গঙ্গা গিলে খেয়েছে। গঙ্গা ভাঙন রোধের যেমন কোনো রকম বন্দোবস্ত ঠিকঠাক নেই, না রাজ্য সরকারের তরফে, না কেন্দ্রের তরফে। ঠিক তেমনভাবেই আমাদের নিয়ে ছেলে খেলা করছে রাজ্য-কেন্দ্র দুই সরকারই। বাড়িঘর জমি জায়গা হারিয়ে উদ্বাস্তুর মত বসবাস করছে। কেউ খবর নেওয়ার প্রয়োজনটুকু মনে করে না! ভোট আসলেই গঙ্গা ভাঙনের কথা, গঙ্গা ভাঙন রোধের কথা বলেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা! ভোট ফুরালে যেমনির তেমনি থেকে যায় বললেন তোয়াব আলি।
কেন্দ্র নাকি গঙ্গা ভাঙনের জন্য কোনরকম বন্দোবস্ত করছে না! রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ভাঙন কবলিত এলাকায় ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করে দিয়ে যান। গঙ্গাভাবন রোধে ১০০ কোটি টাকার কাজ কথায়! কিভাবে একশ কোটি টাকার গঙ্গা ভাঙন রোধের কাজ হল তাও প্রশ্ন তুলেছে স্থানীয় বাসিন্দারা। তাদের প্রশ্ন! বালির বস্তা ফেলেই কি গঙ্গা ভাঙন রোধের সমস্যা সমাধান সম্ভব!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *