হিন্দু উগ্রবাদীদের চাপেই ‘সার’ সঙ্কটে মুসলিমরা উদ্বিগ্ন অমর্ত্য সেন

রাজন্যা নিউজ ব্যুরো বড্ড তাড়াহুড়ো করে এসআইআর করা হচ্ছে। এতে অনেকে সমস্যায় পড়তে পারেন নিম্নবিত্ত এবং প্রান্তিক শ্রেণির মানুষ। উদ্বেগ অমর্ত্য সেনের। তাঁর আশঙ্কা, ‘ভোটাধিকার-সহ বিভিন্ন অধিকারের ক্ষেত্রে সংখ্যালঘুরা অনেকসময় সমস্যায় পড়েন। ইদানিংকালে হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলির অতি-সক্রিয়তায় ভারতের মুসলিমরা সঙ্কটে পড়ছেন। হিন্দুদের একাংশেরও টার্গেটেড হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘অত্যন্ত তাড়াহুড়ো করে এসআইআর করা হচ্ছে। এর ফলে সবার স্বতঃস্ফূর্ত গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণে বাধা সৃষ্টি হতে পারে।’ হাতে সময় খুব কম থাকায়, বহু যোগ্য ভোটারই তাঁদের ভোটাধিকারের প্রমাণ দেওয়ার সুযোগই পাচ্ছেন না, মত নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদের।
এদিন বোস্টন থেকে সংবাদ সংস্থাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এ কথা জানান অর্থনীতিতে নোবেল জয়ী অমর্ত্য সেন। তবে এই উদ্বেগের পাশাপাশি, এসআইআর এর গুরুত্বও উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, গণতন্ত্রে ভোটার তালিকা সংশোধন গুরুত্বপূর্ণ। তবে যথেষ্ট সময় নিয়ে, সাবধানে তা করা উচিত। তিনি বলেন, ‘যথেষ্ট সময় নিয়ে সতর্কভাবে করা হলে সেক্ষেত্রে এসআইআর গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার জন্য ভাল। কিন্তু এখন পশ্চিমবঙ্গে যেটা চলছে সেটা মোটেও সেই রকম নয়।’
অমর্ত্য সেনের অভিযোগ, এসআইআর নিয়ে এত তাড়াহুড়ো করা হচ্ছে, অনেক ভোটারই সময়ের মধ্যে নথি জমা দিতে পারছেন না। তাঁর কথায়, ‘অনেকের এমনও হচ্ছে যে, ভোটাধিকার রয়েছে, অথচ নথিপত্র জমা দেওয়ার মতো হাতে পর্যাপ্ত সময়ই নেই। সামনেই বিধানসভা নির্বাচন। তার আগে এই ভাবে তাড়াহুড়ো করে কাজ করাটা ঠিক নয়। এটি ভোটারদের প্রতি অবিচার। ভারতের গণতন্ত্রের প্রতিও অন্যায়।’
উল্লেখ্য, এসআইআর হিয়ারিংয়ের নোটিশ পেয়েছেন তিনিও। সেই অভিজ্ঞতার কথাও জানান। বলেন, শান্তিনিকেতনের যে কেন্দ্র থেকে তিনি আগেও ভোট দিয়েছেন, সেখানেই তাঁর ভোটাধিকার নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। তাঁর নাম, ঠিকানা ও অন্যান্য তথ্য সরকারি নথিতে আছে। তা সত্ত্বেও, নির্বাচন কমিশনের আধিকারিকরা তাঁর প্রয়াত মায়ের বয়স নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। অথচ তাঁর মা নিজেও ভোটার ছিলেন। সেই তথ্যও সরকারি নথিতে ছিল। অমর্ত্য সেন বলেন, এই ঘটনার থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট। এসআইআর এর আধিকারিকদের উপর প্রচণ্ড চাপ। হাতে খুব কম সময়। তার মধ্যেই তাঁদের কাজ করতে হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, গ্রামীণ ভারতে জন্মানো বহু মানুষের মতো তাঁরও জন্মের শংসাপত্র নেই। ফলে ভোটাধিকার প্রমাণ করতে তাঁকে আরও অন্য নথি জমা দিতে হয়। শেষ পর্যন্ত বিষয়টি মিটলেও, যাঁদের সাহায্য করার মতো কেউ নেই, তাঁদের কথা ভেবে তিনি উদ্বিগ্ন। বলেন, ‘বন্ধুদের সাহায্যে কোনও মতে নির্বাচন কমিশনের ‘কঠিন পরীক্ষা’য় পাশ করেছি। কিন্তু সবার তো আর এমন সাহায্য জোটে না।’
এসআইআর এর ফলে কি কোনও রাজনৈতিক দল লাভবান হতে পারে?
এ বিষয়ে সরাসরি কোনও মন্তব্য করতে চাননি অমর্ত্য সেন। তিনি বলেন, আমি নির্বাচন বিশেষজ্ঞ নই। তবে আমি এটা শুনেছি, এই আন্ডার-অ্যাকাউন্টিংয়ের ফলে বিজেপির লাভ হতে পারে।
তবে তাঁর মতে, কার লাভ হচ্ছে, কার ক্ষতি হচ্ছে সেসব ছেড়ে বরং নির্বাচন কমিশনের কাজের পদ্ধতির দিকে বেশি নজর দেওয়া প্রয়োজন। একজনও বৈধ ভোটার যাতে বাদ না যান, সেদিকে নজর দেওয়া জরুরি।
এসআইআর এর ফলে কাদের সবচেয়ে ক্ষতি হতে পারে? ‘দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষ,’ সাফ জবাব অমর্ত্য সেনের। বলেন, তাঁদের পক্ষে প্রয়োজনীয় নথি সংগ্রহ করা কঠিন।
‘ভোটাধিকার-সহ বিভিন্ন অধিকারের ক্ষেত্রে সংখ্যালঘুরা অনেকসময় সমস্যায় পড়েন। ইদানিংকালে হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলির অতি-সক্রিয়তায় ভারতের মুসলিমরা সঙ্কটে পড়ছেন। হিন্দুদের একাংশেরও টার্গেটেড হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।’
নির্বাচন কমিশন এবং সুপ্রিম কোর্টের ভূমিকার উপর জোর দিয়েছেন অমর্ত্য সেন। তাঁর দাবি, দেশের কোনও প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিক যাতে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত না হন, তা নিশ্চিত করাই কমিশন ও আদালতের দায়িত্ব। আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে তিনি নিজে ভোট দিতে আগ্রহী বলেও জানিয়েছেন। তবে কবে তাঁর কেন্দ্রের ভোট হবে, তার উপরই সব কিছু নির্ভর করছে বলে জানান।
অতীতের এক অভিজ্ঞতার কথাও বললেন অমর্ত্য সেন। বলেন, ‘একবার ভোট দিতে মাত্র ৪৮ ঘণ্টার জন্য শান্তিনিকেতন গিয়েছিলাম। কেমব্রিজ থেকে লন্ডন, দিল্লি, কলকাতা হয়ে শান্তিনিকেতন। ভোট দিয়েই আবার ২ দিনের মধ্যে কেমব্রিজ ফেরত। এখন আর সেই বয়স নেই। ৯২ বছর। অতটা ধকল নিতে পারি না। তখন ৮২ বছর বয়স ছিল।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *