হাসপাতালের নিরাপত্তা সংক্রান্ত স্বাস্থ্য বৈঠক নবান্নে, একাধিক বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ মুখ্যমন্ত্রীর
কল্যাণ অধিকারী, রাজন্যা নিউজ
স্বাস্থ্য সংক্রান্ত একাধিক বিষয়ের উপর নজরদারি বাড়াতে শনিবার উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হল নবান্নে। সম্প্রতি উলুবেড়িয়ায় মহিলা চিকিৎসককে মারধর ও ধর্ষণের হুমকির অভিযোগে উঠেছিল। তারপর এসএসকেএম হাতসপাতালের ট্রমা কেয়ারের শৌচাগারে নাবালিকাকে ‘যৌন হেনস্থা’ করার অভিযোগ ওঠে। আরজিকর হাসপাতাল কান্ডের পর আবারও রাজ্যের দু’দুটি হাসপাতালে একাধিক অভিযোগ উঠতেই, বিভিন্ন মহল থেকে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখছে নবান্ন। সেইমতন নবান্নে স্বাস্থ্য বৈঠক। উপস্থিত মুখ্যসচিব-নগরপাল। তাঁদের সঙ্গে ভারচুয়ালি যোগ দিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এছাড়াও এই বৈঠকে সমস্ত সরকারি হাসপাতালের সুপার, মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষ ও সমস্ত জেলাশাসক, পুলিশ সুপারের ভারচুয়াল হাজিরায় একগুচ্ছ নির্দেশিকা জারি হয়েছে বলে নবান্ন সূত্রে খবর।
উলুবেড়িয়া শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় গভর্নমেন্ট মেডিক্যাল কলেজে মহিলা চিকিৎসকে নিগ্রহের ঘটনায়, ওই চিকিৎসকের গোপন জবানবন্দি নিয়েছে পুলিশ। তারপরেই ধৃত তিন জনের বিরুদ্ধে এ বার শ্লীলতাহানির ধারাও যোগ করেছে পুলিশ। একি সঙ্গে নিগ্রহের ঘটনার তদন্তে আট জনের কমিটি হয়েছে উলুবেড়িয়া হাসপাতালে। অন্যদিকে এসএসকেএম-এর ট্রমা কেয়ারের শৌচাগারে নাবালিকাকে ‘যৌন হেনস্থা’র অভিযোগ ওঠার পর একাধিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে পুলিশ। অভিযুক্তকে দ্রুত গ্রেফকার করা হয়েছে। পকসো আইনে রুজু করা হয় মামলা। ইতিমধ্যে, হাসপাতালের ট্রমা কেয়ারে যান কলকাতা সিপি মনোজ বর্মা। নিরাপত্তা ব্যবস্থা খতিয়ে দেখেছেন সিপি, এমনটাই খবর হাসপাতাল সূত্রে। কীভাবে এত বড়মাপের হাসপাতালের অন্দরে, অবাধে ঘুরে বেড়াচ্ছে বহিরাগতরা, তা নিয়ে ক্ষোভ উগরে দিচ্ছেন স্বাস্থ্যকর্মী, রোগীর আত্মীয়রা। বিষয়টি নিয়ে নড়েচড়ে বসেছে প্রশাসন। এই সমস্ত কারণেই তড়িঘড়ি বৈঠক ডাকা হয় নবান্নে বলে জানা যাচ্ছে। বিভিন্ন সূত্রে জানা গিয়েছে, মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নির্দেশে শনিবার দুপুর ১২টায় উচ্চপর্যায়ের বৈঠক ডাকা হয়েছিল। মুখ্যসচিব মনোজ পন্থের নেতৃত্বে হয় এই বৈঠক।
সূত্রের খবর, উচ্চ পর্যায়ের এই বৈঠক থেকে মুখ্যমন্ত্রীর পরামর্শ মতো বিভিন্ন বিষয়ে জোর দেওয়া হয়েছে। হাসপাতাল কর্মীদের প্রশিক্ষণ, নির্দিষ্ট পোশাক ও ডিউটি রস্টারের দিকে। এছাড়া কর্মী নিয়োগের আগে তাঁদের অতীত কাজের রেকর্ড খুঁটিয়ে দেখার কথা বলেছেন মুখ্যমন্ত্রী। জানা যাচ্ছে, প্রশাসনের কাছে একাধিক বিষয় জানতে চেয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। হাসপাতালে সিসিটিভি থাকলেও নজরদারি চালানো হচ্ছে না বলেই জানতে পেরেছেন তিনি। এছাড়া, হাসপাতালের নিরাপত্তায় গলদ কোথায় তাও জানতে চেয়েছেন। এই বৈঠকে সরকারি হাসপাতালের পাশাপাশি বেসরকারি হাসপাতালগুলির নিরাপত্তা নিয়েও আলোচনা হয়েছে বলেই খবর সূত্রের। কারণ চলতি মাসে দুর্গাপুরের এক বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজের ছাত্রীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছিল। যদিও তদন্তে উঠে আসে, তা গণধর্ষণ নয়, ধর্ষণের ঘটনা। এবং ওই ঘটনায় প্রত্যক্ষ যোগ রয়েছে ওই ছাত্রীর ঘনিষ্ঠ বন্ধুর। কিন্তু বিষয়টি নিয়ে রাজনীতিক ঝড় তোলার চেষ্টা করেছিল বিরোধীরা এমনটাই অভিযোগ ছিল শাসক দলের। বিষয়টি নিয়ে দিল্লি পর্যন্ত জল ঘোলা করার চেষ্টা চলে। এসব নিয়ে রাজ্যের হাসপাতালগুলির নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে থাকে।
বছর ঘুরলেই রাজ্যে নীল বাড়ির লড়াই। শাসকের বিরুদ্ধে এই সমস্ত বিষয় নিয়ে মাঠে নামতে পারে প্রধান বিরোধী বিজেপি ও বামেরা। তার আগেই হাসপাতাল প্রসঙ্গে শনিবারের বৈঠকের অনেক তাৎপর্য। জানা যাচ্ছে মুখ্যসচিব মনোজ পন্থের নেতৃত্বে বৈঠক ছিল। সেখানে মুখ্যমন্ত্রী ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন সরকারি হাসপাতালের অধ্যক্ষ,সুপাররা। একই সঙ্গে ছিলেন কলকাতা পুলিশের কমিশনার সহ সব জেলার জেলাশাসক, সব জেলার পুলিশ সুপাররাও। সংশ্লিষ্ট বৈঠক থেকে জানা যাচ্ছে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একাধিক বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। সূত্রের খবর, মুখ্যমন্ত্রী এ দিন প্রশ্ন তুলেছেন, পুরুষ শৌচাগারে নাবালিকাকে কী করে নিয়ে যাওয়া হল? কেন সিসিটিভিতে গোটা বিষয়টি ধরা পড়ল না? একই সঙ্গে এ দিনের বৈঠকে প্রশ্ন উঠছে, কেন চুক্তিভিত্তিক কর্মীদের পুরনো অপরাধের দায় সরকারকে নিতে হবে? বস্তুত, এসএসকেএম হাসপাতালের ঘটনায় যে অভিযুক্ত গ্রেফতার হয়েছে তাঁর ক্রিমিনাল ব্যাকগ্রাউন্ড রয়েছে বলে জানা গিয়েছে।
এ দিনের বৈঠকে একাধিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে সূত্রের খবর।
*যে সব এজেন্সি থেকে প্রাইভেট সিকিউরিটি নেওয়া হচ্ছে, তাঁদের পুলিশ ভেরিফিকেশন বাধ্যতামূলক। চুক্তি ভিত্তিক কর্মীদের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম প্রযোজ্য।
*সিসিটিভি ক্যামেরাগুলি চালু বা অক্ষত আছে কি না তার জন্য মনিটরিং করতে হবে। মাঝে মাঝেই ফায়ারের জন্য মক ড্রিল করতে হবে।
*ওয়ার্ডের ভিতরে বহিরাগতরা ঢুকতে পারবে না।
*প্রতিদিন ডিউটিতে যোগ দেওয়ার সময় কাদের কাদের ডিউটি থাকছে, সেটা নিয়ে রোস্টার তৈরি করতে হবে।
*রোল কল করতে হবে।
*ডিউটি শেষ হওয়ার সময়েও রোল কল করতে হবে।

