ভারতের দ্বিতীয় বৃহত্তম তীর্থযাত্রীদের সমাবেশ গঙ্গাসাগরে
কল্যাণ অধিকারী এডিটর রাজন্যা নিউজ
দুপুর সোয়া একটা, শাহী স্নানের পূণ্যলগ্ন শুরু হতেই সাগরের জলে পুণ্যডুব দেওয়া শুরু করে দেন ভক্তরা। বুধবার থেকেই গঙ্গাসাগরের তটে লাখো মানুষের ভিড় জমতে শুরু করেছে। বিকালের সাংবাদিক সম্মেলনে মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস বলে দিলেন, বুধবার বিকাল তিনটে পর্যন্ত ৮৫ লক্ষ মানুষের জনসমাগম হয়েছে সাগরে। এরপরেই কেন্দ্রকে নিশানা করে বলেন, শুধুমাত্র প্রতিহিংসার কারণেই জাতীয় মেলা ঘোষণা করছে না! কারণ বাংলায় এই মেলা হয়। আমাদের নেত্রী বলেছেন, এ বার সব সাগর এক বার, গঙ্গাসাগর বার বার। আপনারা তো দেখছেন, লক্ষ-লক্ষ মানুষজন আসছেন। এত সুন্দর ব্যবস্থাপনা, মানুষজন সহজেই পৌঁছে যাচ্ছে। সাগরে স্নান সেরে পুজো দিচ্ছেন। তারপর ফিরে যাচ্ছেন। এরপর প্রশ্ন তোলেন, গঙ্গাসাগর মেলা জাতীয় মেলা না হলে, কোন মেলাকে জাতীয় মেলা বলা হবে?
বিকালের সাংবাদিক সম্মেলনে একসঙ্গে রাজ্যের ৬য় মন্ত্রী হাজির ছিলেন। সঙ্গে ছিলেন সাংসদ, সুভাধিপতি, জেলা পরিষদ-সহ অনেকে। অরূপ বিশ্বাস জানান, লক্ষ লক্ষ পুন্যার্থীদের পুন্যস্নান সুনিশ্চিত করার জন্য পুলিশকর্মীর সঙ্গে সিভিল ডিফেন্স ভলান্টিয়ার, কুইক রেসপন্স টিম, ডিপ ড্রাইভার, ন্যাভাল ড্রাইভার, এন.ডি.আর.এফ এবং কোস্ট গার্ড দিবারাত্রি কাজ করে চলেছেন। পাশাপাশি গঙ্গাসাগর মেলার সময় সমুদ্রতট পরিষ্কার রাখার জন্য ৩০০০ হাজারেরও বেশী সৈকত প্রহরী নিযুক্ত করা হয়েছে। -গঙ্গাসাগরে তীর্থযাত্রীদের সহায়তায় ১৫০টি সমাজসেবী সংগঠনের প্রায় ১০হাজার জন স্বেচ্ছাসেবক দিবারাত্রি নিযুক্ত আছেন। সাগরসঙ্গমে পুণ্যস্নানের স্মৃতি অক্ষয় করে রাখতে তীর্থযাত্রীরা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে নিজের ছবি সম্বলিত শংসাপত্র এবার পেয়ে যাচ্ছেন বন্ধন নামের ফটোবুথে। সাগরে সর্বমোট বন্ধন ফটোবুথের সংখ্যা ১৫ টি। এখনও পর্যন্ত প্রায় ৫ লক্ষ ৭৫ হাজার পুণ্যার্থী ছবি সম্বলিত শংসাপত্র সংগ্রহ করেছেন।
এখনো পর্যন্ত ৪৮৮৩ জন আগত তীর্থযাত্রী তাদের আত্মীয় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল। পুলিশ, প্রশাসন ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের তৎপরতায় ৪৮৬০ জনকে তাদের পরিবারের সাথে মিলিয়ে দেওয়া হয়েছে। এটা সম্ভব হয়েছে মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায়ের মস্তিষ্ক প্রসূত ‘ই-পরিচয়’ তথা কিউ আর কোড রিস্ট ব্যান্ডের সাহায্যে। এখনো পর্যন্ত ২৭২ টি পকেটমারীর ঘটনা ঘটেছে, যার মধ্যে ২৬০টি ক্ষেত্রে খোয়া যাওয়া বস্তু উদ্ধার করে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ফেরৎ দেওয়া হয়েছে। ও ৬৭২ জনকে বিভিন্ন অপরাধমূলক জনিত কারণে গ্রেফতার করা হয়েছে।
আগত তীর্থযাত্রীদের মধ্যে সাগরে ১ জনের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। আসামের বাসিন্দা ওই ব্যক্তির নাম মিঠু মণ্ডল। বয়স ৫১ বছর। মেলায় এসে স্ট্রোকে আক্রান্ত হন তিনি। সাগরের অস্থায়ী হাসপাতালে ভর্তি করানো হয় তাঁকে। সেখানেই তাঁর মৃত্যু হয়। বুধবার পর্যন্ত মোট ৫জন অসুস্থকে এয়ার লিফট করে কলকাতায় পাঠানো হয়েছে। উত্তর প্রদেশের বাসিন্দা সন্তলাল, বয়স ৬৪, হরিয়ানার বাসিন্দা বিমলাদেবী, বয়স ৭৭, রমেশচন্দ্র, বয়স ৫২, উত্তরপ্রদেশ রাজ্যের বাসিন্দা তিনি। বিহারের বছর ৫০-এর আশাদেবী এবং প্রেমাকান্তিদেবী, বয়স ৭২। প্রসঙ্গত গঙ্গাসাগরে এসে ভারত সেবাশ্রম সঙ্ঘে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণা করেছিলেন, ৯ থেকে ১৭ জানুয়ারি, মেলাপর্বে কোনও পুলিশ বা প্রশাসনের আধিকারিক, কর্মী, সাংবাদিক, সাধারণ মানুষের মৃত্যু হলে তাঁর পরিবারকে পাঁচ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে। এক্ষেত্রে আসামের মৃত ব্যক্তি মিঠুর পরিবারের হাতে ৫ লক্ষ টাকা তুলে দেবে প্রশাসন!
দুপুর থেকে স্নানের পাশাপাশি কপিল মুনির আশ্রমে পুজো দেওয়ার জন্য ভক্তদের লম্বা লাইন চোখে পড়ছে। তিল ধারণের জায়গা নেই মন্দির চত্বরেও। ভিড় সামলাতে মেলা চত্বরে মোতায়েন করা হয়েছে কয়েক হাজার পুলিশ ও ভলান্টিয়র। ড্রোন ও সিসিটিভি ক্যামেরার মাধ্যমে চলছে কড়া নজরদারি। বিশেষ করে স্নানঘাটে কোনো রকম দুর্ঘটনা এড়াতে সিভিল ডিফেন্স ও বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী এবং নৌবাহিনী জলপথে নিরন্তর টহল দিচ্ছে। ভিন রাজ্যের তীর্থযাত্রিদের দাবি, মাহেন্দ্রক্ষণ বুধবার দুপুর দেড়টা। বিশ্বাস, সেই সময় গঙ্গাস্নান করলে মোক্ষলাভ হয়। তবে মাহেন্দ্রক্ষণের আগে, ভোর থেকেই লক্ষাধিক পুণ্যার্থী সাগরের বিভিন্ন ঘাটে সাগরস্নানে নেমে পড়েছেন। স্নান শেষে কপিলমুনি আশ্রমের সামনে পৌঁছানোর জন্য লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে। প্রশাসনের তরফে ভিড় নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তায় বাড়তি নজরদারি রাখা হয়েছে। আজ বুধবার দিনভর ও কাল বৃহস্পতিবার আরও বিপুল সংখ্যক পুণ্যার্থীর আগমন ঘটবে বলে মনে করা হচ্ছে।
মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশে গঙ্গাসাগরে রয়েছে, মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস, মন্ত্রী, বঙ্কিমচন্দ্র হাজরা, মন্ত্রী পুলক রায়, মন্ত্রী সুজিত বোস, বেচারাম মান্না, দিলীপ মন্ডল, মথুরাপুর লোকসভা কেন্দ্রের সাংসদ বাপি হালদার, দক্ষিন ২৪ পরগনা জেলা পরিষদের সভাপতি নীলিমা মিস্ত্রী বিশাল, রয়েছেন বিধায়ক যোগরঞ্জন হালদার, গিয়াস উদ্দিন মোল্লা, বিভাস সরদার, গঙ্গাসাগর বকখালি উন্নয়ন পরিষদের সহসভাধিপতি শ্রীমন্ত মালি, অতিরিক্ত মুখ্যসচিব, সুন্দরবন বিষয়ক, এছাড়া সুরেন্দ্র গুপ্তা, ডঃ সৌমিত্র মোহন, সুমিত গুপ্তা, জেলাশাসক অরবিন্দ কুমার মিনা, কোটেশ্বর রাও।

