খালেদা জিয়া প্রয়াত, তিনবারের প্রধানমন্ত্রী থেকে ১৭ বছর জেল

রাজন্যা নিউজ ব্যুরো, ঢাকা

চিকিৎসকদের সমস্ত চেষ্টা ব্যর্থ। দীর্ঘ লড়াইয়ের অবসান। ৮০ বছর বয়সে প্রয়াত হলেন বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি-এর চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া। তিনি ছিলেন বাংলাদেশের প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী। তিনি মঙ্গলবার ভোরে প্রয়াত হন। ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। সেখানেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। খালেদা জিয়ার মৃত্যুসংবাদ জানিয়েছে তাঁর দল বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট পার্টি।
খালেদা জিয়া ছিলেন বিএনপি চেয়ারপারসন ও তিনবারের প্রধানমন্ত্রী। তাঁরû মৃত্যুতে দেশজুড়ে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। মঙ্গলবার সকালে তাঁর মৃত্যুসংবাদ ছড়িয়ে পড়ার পর রাজধানী ঢাকা’সহ জেলায় জেলায় বিএনপি নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের মাঝে শোকাবহ পরিবেশ সৃষ্টি হয়। বিভিন্ন জেলায় দলীয় কার্যালয়ে কালো পতাকা উত্তোলন, কুরআন তেলাওয়াত, দোয়া মাহফিল ও শোকসভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
বয়সজনিত একাধিক অসুখ ছিল খালেদার। সিরোসিস অফ লিভারে ভুগছিলেন দীর্ঘদিন ধরে। চলছিল লাস্ট স্টেজ। এছাড়াও আর্থারাইটিস, ডায়াবেটিসের রোগী ছিলেন বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী। সম্প্রতি বুকে যন্ত্রণা এবং হৃদযন্ত্রের সমস্যাও দেখা দিয়েছিল। এমনটাই জানিয়েছেন তাঁর চিকিৎসকরা।
গত ২৩ নভেম্বর থেকে ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালের সিসিইউ’তে ভর্তি ছিলেন তিনি। ১১ ডিসেম্বর তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে ভেন্টিলেটর সাপোর্টে রাখা হয়। মাত্র ২ দিন আগেই তাঁর ব্যক্তিগত চিকিৎসক জানিয়েছিলেন, প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর শারীরিক অবস্থা গুরুতর। একটি ফেসবুক পোস্টে বিএনপি জানিয়েছে, মঙ্গলবার ভোর ৬টা নাগাদ চিকিৎসকরা খালেদা জিয়াকে মৃত বলে ঘোষণা করেছেন।
পোস্টে বলা হয়েছে, ‘সোমবার রাত থেকে খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার ক্রমশ অবনতি হতে শুরু করে। কাতারের একটি বিশেষ এয়ারক্র্যাফট স্টান্ডবাই হিসেবে রাখা হয়েছিল। যে কোনও মুহূর্তেই সেটি খালেদা জিয়াকে নিয়ে উড়ে যেত লন্ডন। সেখানেই তাঁর পরবর্তী চিকিৎসা চলত। তবে এভারকেয়ার হাসপাতাল থেকে ঢাকা বিমানবন্দরে নিয়ে যাওয়ার জন্য তাঁর মেডিকেল বোর্ড অনুমতি দেয়নি।’
সোমবারই বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচনের জন্য মনোনয়ন জমা করা হয়েছিল খালেদা জিয়ার নামে। বগুরা-৭ নম্বর আসন থেকে ভোটে দাঁড়ানোর কথা ছিল তাঁর। ১৭ বছরের নির্বাসিত জীবন কাটিয়ে অবশেষে গত সপ্তাহেই তাঁর ছেলে তারেখ রহমান লন্ডন থেকে ঢাকা ফিরেছেন। রবিবারই তিনি এভারকেয়ার হাসপাতালে গিয়েছিলেন মায়ের সঙ্গে দেখা করতে। হাসপাতালে খালেদা জিয়ার সঙ্গে ২ ঘণ্টা ছিলেন ছেলে তারেক। বাংলাদেশের নির্বাচনে তাঁকেই এবারে বিএনপি’র মুখ হিসেবে ধরা হচ্ছে।
তারেক রহমান ২টি আসন থেকে লড়বেন, ঢাকা-১৭ এবং বগরা-৬। এই আসন একটা সময়ে খালেদা জিয়ার শক্ত ঘাঁটি হিসেবেই পরিচিত ছিল। তবে ২০২৩ সালে এই আসনে জয়লাভ করেন আওয়ামী লিগের রাগেবুল আসান রিপু।
জিয়াউর রহমানের স্ত্রী হিসেবে বাংলাদেশের রাজনীতিতে পরিচিত হয়েছিলেন খালেদা। তবে পরবর্তীতে স্বামীর মৃত্যুর পর হাল ধরেছিলেন বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট পার্টির। ধীরে ধীরে তৈরি হয় তাঁর নিজস্ব পরিচিতি। ১৯৯১ সালে বংলাদেশের প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছিলেন খালেদা। দু’দফায় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন তিনি। প্রথমবার ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ পর্যন্ত। দ্বিতীয়বার ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত।
নারীশিক্ষার প্রসারে খালেদা সরকারের ভূমিকা প্রশংসিত হয়েছে সর্বত্রই। তবে তাঁর আমলে হয়েছে বিস্তর দুর্নীতিও। ২০১৮টি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থায় দুর্নীতির অভিযোগে ১৭ বছরের কারাদণ্ডের সাজাও হয় খালেদা জিয়ার। সেই সময় থেকেই একাধিকবার অসুস্থ হতে থাকেন তিনি। হাসিনা সরকারের পতনের পর তাঁর উপর থেকে সমস্ত অভিযোগ থেকে মুক্ত করা হয়।
আজ যেই মানুষটিকে বেগম খালেদা জিয়া নামে সকলে চেনেন, তাঁরই ছোটবেলার নাম ছিল খালেদা খানম পুতুল। তিনি ১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট জন্মগ্রহণ করেন দিনাজপুর শহরের মুদিপাড়া এলাকায়। তাঁর বাবা জনাব ইস্কান্দর মজুমদার এবং মা বেগম তৈয়বা মজুমদার। তাঁরা তিন বোন এবং দুই ভাই। জনাব ইস্কান্দর মজুমদার ছিলেন একজন ব্যবসায়ী।
খালেদা একদম ছোট বয়সে মিশন ßুñলে পড়াশোনা করেন। ৫ বছরেই সেখানে ভর্তি হন। এরপর দিনাজপুর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে পাশ করেন ১৯৬০ সালে। সেই বছরই তাঁর বিয়ে হয় জিয়াউর রহমানের সঙ্গে। তখনই তাঁর নাম হয় খালেদা জিয়া বা বেগম খালেদা জিয়া।
তাঁর স্বামী জিয়াউর রহমান ছিলেন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর একজন ক্যাপ্টেন। পরবর্তী সময় তিনি বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হন।
১৯৮১ সালে খালেদার জীবন এক কঠিন সময় আসে। সেই বছর ৩০ মে সামরিক অভ্যুত্থানে প্রাণ হারান জিয়াউর রহমান। এরপরই খালেদার রাজনীতিতে প্রবেশ। তিনি ১৯৮২ সালে বিএনপি’তে যোগ দেন। ১৯৮৪ সালের ১০ মে দলের চেয়ারপার্সন হিসেবে তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হন। এরপরই তাঁর জীবন নতুন মোড় নেয়।
সালটা ছিল ১৯৯১। সেই বছরই প্রথমবারের জন্য নির্বাচনে জয়ী হয়ে প্রধানমন্ত্রী হন খালেদা জিয়া। তারপর আবার ১৯৯৬ সালে তাঁর মাথায় চাপে একই দায়িত্ব। তবে সেই দফায় রাজনৈতিক চাপে তিনি প্রধানমন্ত্রীত্ব ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। এরপর আবার তিনি ২০০১ সাল থেকে প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। ২০০৬ সাল পর্যন্ত তিনি এই দায়িত্ব সামলেছেন।
তবে ২০০৭ সাল থেকে খালেদা জিয়ার জীবনে নেমে আসে অন্ধকার। এই সময় তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক মামলা হয়। ১ সেপ্টেম্বর ২০০৭ তাঁকে দুর্নীতির মামলায় গ্রেফতার করা হয়। এই সময় তিনি এক বছরের বেশি সময় কারাগারে ছিলেন। ২০০৮ সালের সেপ্টেম্বরে আদালতের নির্দেশে জামিনে মুক্তি পান। শুধু তাই নয়, ২০১৮ সালে, জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলা এবং জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় জিয়াকে মোট ১৭ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
তবে ২০১৯ সালের এপ্রিল থেকেই স্বাস্থ্যের অবনতি হয় তাঁর। এই সময় তাঁকে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। ২০২০ সালের মার্চে মানবিক কারণে তাঁকে ছয় মাসের জন্য গৃহবন্দি করে মুক্তি দেওয়া হয়।
যদিও জুলাই অভ্যুত্থানের পর খেলা ঘুরে যায়। এই সময় হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হন। এরপরই নতুন সরকার খালেদাকে সব মামলা থেকে মুক্তি দেয় নতুন সরকার। তারপরই ভোটে লড়ার জন্য তৈরি হচ্ছিলেন জিয়া। তবে সেই ইচ্ছে পূরণ হল না। আজ ৮০ বছর বয়সে তিনি প্রয়াত হলেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *