দুর্গা অঙ্গন শিলান্যাসে বললেন মমতা আমি তোষণ করি না আমিই প্রকৃত সেকুলার
রাজন্যা নিউজ, কলকাতা: ভিন্ন ধর্ম মানেই ভিন্ন রীতি, আর সেই রীতিকে সম্মান জানানোই তাঁর রাজনৈতিক ও মানবিক বিশ্বাসের অংশ। সোমবার নিউ টাউনে দুর্গা অঙ্গনের শিলান্যাস করে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা ‘তোষণের রাজনীতি’র অভিযোগ খারিজ করে মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট ভাষায় জানালেন, ‘সব ধর্মের আলাদা আলাদা নিয়ম রয়েছে। অন্য ধর্মের অনুষ্ঠানে গেলে সেই নিয়ম মানতেই হবে।’ মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘আমার কাছে যে ধর্মের মানুষই আসুন না কেন, আমি চেষ্টা করি তাঁদের পাশে থাকতে। আমি তোষণ করি না। আমি সর্বধর্ম সমন্বয়ে বিশ্বাস করি।’ তিনি বলেন, তাঁর রাজনীতির ভিত্তি কোনও বিশেষ ধর্ম নয়, বরং সর্বধর্ম সমন্বয় ও মানবিকতার দর্শন। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘শিখদের অনুষ্ঠানে গেলে মাথায় কাপড় ঢাকি-তখন তো কেউ প্রশ্ন তোলে না। তাহলে রোযায় গেলে আপত্তি কোথায়?’ একই সঙ্গে হুঁশিয়ারির সুরে বলেন, অনেক সহ্য করা হচ্ছে, কিন্তু সহ্যেরও একটি সীমা আছে।’
৫১ বিঘার বেশি জায়গায় তাক লাগানো স্থাপত্য! দিঘার জগন্নাথ মন্দিরের মতোই নিউ টাউনে সগর্বে প্রতিষ্ঠা পাবে দুর্গা অঙ্গন। দুর্গা পুজোকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দিয়েছে ইউনেস্কো। কিন্তু সেই দুর্গা ঠাকুর দর্শন করতে হলে আসতে হত শুধুমাত্র শরৎকালে দুর্গাপুজোর সময়। আর এবার সারা বছরই যাতে বাংলায় দুর্গাদর্শন করা যায় তার জন্য বিশেষ উদ্যোগ।
১৭ একরেরও বেশি জমির উপরে তৈরি হতে চলেছে এই দুর্গা অঙ্গন। নিউটাউনের এই দুর্গা অঙ্গনে দেবী দুর্গা এবং তাঁর সন্তানদের মন্দির থাকবে। প্রত্যেকটা মন্দিরে নিত্য পুজোর আয়োজন থাকবে। দু’বছরের মধ্যে কাজ শেষ হবে এই মন্দিরের। দিঘার জগন্নাথধামের মত দুর্গা অঙ্গনও স্থাপত্যের নিদর্শন হতে চলেছে। মূল মন্দিরের প্রবেশ পথে থাকবে সিংহ।
মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন, বিশ্বের বৃহত্তম দুর্গা অঙ্গন হিসেবে পরিচিত হবে। এটি করতে পেরে গর্বিত। ধর্ম যার যার, উৎসব সবার। এই অনুষ্ঠানে হাজির রয়েছেন সব ধর্মের মানুষ। মঞ্চে রয়েছেন হিন্দু, বৌদ্ধ, মুসলিম, খ্রিস্টান সহ সব সম্প্রদায়ের মানুষ। ৩৬৫ দিন মা দুর্গার পুজো হবে। নানা রকম সাংßৃñতিক অনুষ্ঠান দেখা যাবে প্রতিদিন। এই দুর্গা অঙ্গন ঘিরে কর্মসংস্থান হবে। জগন্নাথ মন্দির যাঁরা তৈরি করেছেন, তাঁরাই তৈরি করেবেন এই দুর্গা অঙ্গন। ১ হাজার লোক একসঙ্গে বসতে পারবে মন্দির চত্বরে। ১০০৮টি স্তম্ভ তৈরি করা হবে। মূলে গর্ভগৃহের উচ্চতা হবে ৫৪ মিটার। ১০৮টি দেব দেবীর মূর্তিও ৬৪ সিংহমূর্তি বসানো হবে।
দুর্গার যে বিভিন্ন নাম রয়েছে সেই নামগুলো এই মন্দিরের মধ্যে খোদাই করা থাকবে। লাল রঙের পাথরের আর মার্বেল দিয়ে তৈরি হবে এই মন্দির। হিডকোর তত্ত্বাবধানে দুর্গা অঙ্গন তৈরি হবে। ইতিমধ্যেই একটি ট্রাস্ট তৈরি করে দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। যে ট্রাস্ট যাবতীয় বিষয় দেখাশোনা করবে। ইকোপার্কের উল্টোদিকের জমির পরিবর্তে অ্যাকশন এরিয়া ওয়ানে নিউ টাউন বাস টার্মিনাসের উল্টোদিকের একটি জমিতে মুখ্যমন্ত্রীর স্বপ্নের প্রকল্প গড়ে তোলা হবে বলে জানিয়েছেন সরকারি আধিকারিকরা।
উল্লেখ্য, তৃণমূলের শহিদ দিবস অর্থাৎ ২১ জুলাই মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়েছিলেন, ‘জগন্নাথধামের মতো দুর্গা অঙ্গন তৈরি করব, যাতে মানুষ সারা বছর সেখানে আসতে পারেন’। জগন্নাথ ধাম তৈরি করে গোটা রাজ্যে সাড়া ফেলে দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। ৩০ এপ্রিল, অক্ষয় তৃতীয়ার দিনে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় উদ্বোধন করেন এই জগন্নাথ ধাম। উদ্বোধনের দিন থেকে ২৮ নভেম্বর অবধি মাত্র আট মাসেই দর্শনাথীর সংখ্যা পেরোয় কোটির গণ্ডি।
রবিবার দিঘায় জগন্নাথ মন্দিরে আগত এক কন্যাশিশুকে প্রতীকীভাবে কোটিতম দর্শনার্থী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ওই শিশুকন্যা হলেন কাকলি জানা। কলকাতার টালিগঞ্জের বাসিন্দা সুরজিৎ জানার কন্যা। এই উপলক্ষে তাকে বিশেষভাবে সম্মানিত করা হয়। মন্দির কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে পরিবারটিকে বিশেষ দর্শনের সুযোগ, মহাপ্রসাদ, পুষ্পমালা ও প্রসাদ প্রদান করা হয়। এই বিরল গোত্রের উদযাপনে অংশগ্রহণ করতে গিয়ে পরিবারটির আনন্দ ও আবেগ ছিল স্পষ্ট।
এদিকে, দিঘায় এবার ‘ধ্বজাসেবা’ করতে পারবেন ভক্তরা। সদ্যই এই পরিষেবা শুরু করেছে মন্দির কর্তৃপক্ষ। ‘ধ্বজাসেবা’র জন্য আগে থেকে বুকিং করতে হবে। সেক্ষেত্রে একটি নম্বরে যোগাযোগ করতে হবে। ওই নম্বরে ফোন করে ধ্বজা ওড়ানোর দিনক্ষণ স্থির করতে পারবেন পুণ্যার্থীরা।
প্রসঙ্গত, বিধানসভা ভোটের মুখে দার্জিলিঙে দাঁড়িয়ে অক্টোবরে বড় ঘোষণা করেন মুখ্যমন্ত্রী। শিলিগুড়িতে মহাকাল মন্দির তৈরির ঘোষণা করেন তিনি। জানান, ‘দার্জিলিঙের জেলাশাসককে বলেছি, শিলিগুড়ির আশপাশে একটা ভাল জমি দেখতে। একটা বড় মহাকাল মন্দির করব। সেখানে সবচেয়ে বড় শিবঠাকুর তৈরি করব’।
প্রসঙ্গত, শিল্পকলা, ঐতিহ্যচর্চা ও সাংßৃñতিক কর্মকাণ্ডের জন্য আলাদা পরিকাঠামোও রাখা হচ্ছে এই প্রকল্পে। এ বছর অক্ষয় তৃতীয়ায় দিঘায় জগন্নাথ মন্দিরের উদ্বোধন করেন মুখ্যমন্ত্রী। ইসকনের দাবি অনুযায়ী, রবিবার সেই মন্দিরে পুণ্যার্থীর সংখ্যা প্রায় এক কোটিতে পৌঁছেছিল। পাশাপাশি, সম্প্রতি উত্তরবঙ্গ সফরে গিয়ে মাটিগাড়ায় নতুন মহাকাল মন্দির নির্মাণের জন্য জমি বরাদ্দের কথাও ঘোষণা করেছিলেন তিনি। তাৎপর্যপূর্ণভাবে, এই শিলান্যাসের অনুষ্ঠান থেকেই মহাকাল মন্দিরের শিল্যানাস নিয়ে বড় ঘোষণা করে দেন মমতা। জানিয়েছেন, জানুয়ারি মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহেই সেই মন্দিরের শিল্যানাস হবে। জমিও দেখা হয়ে গেছে, পরিকল্পনা তৈরি।

