একটা পয়সা কারোর থেকে পাইনি, ত্রাণ-সাহায্য একাই সামলাচ্ছে রাজ্য:মমতা
কল্যাণ অধিকারী, রাজন্যা নিউজ
দুর্যোগে বিপর্যস্ত উত্তরবঙ্গের দার্জিলিংয়ের ৯টি ব্লক এবং ৪টি মহকুমা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একটা পয়সাও কারোর থেকে পাইনি, তবুও রাজ্য সরকারের তরফ থেকে এত কিছু করা হয়েছে। বুধবার দার্জিলিংয়ে জেলাশাসক, পুলিশ সুপারদের নিয়ে প্রশাসনিক বৈঠক করেন মুখ্যমন্ত্রী। ওই বৈঠকে জানান মুখ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, ১৩০০-রও বেশি মানুষকে উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধারকাজে যুক্ত প্রশাসনিক টিম বিডিও, ডিএম, এসপি, পুলিশ, এনডিআরএফ শামিল ছিল। প্রত্যেকেই কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। দুর্যোগের পর উত্তরবঙ্গে এখনও পর্যন্ত কী কী কাজ করেছে রাজ্য সরকার, তার খতিয়ান তুলে ধরেন মমতা।
মুখ্যমন্ত্রী জানান, দুধিয়া ব্রিজ ভেঙেছে, ৭ দিনের মধ্যে সেখানে একটি অস্থায়ী ব্রিজ তৈরি করে দেওয়া হচ্ছে। মিরিক বাজার, সুখিয়াপোখরিতে রিলিফ ক্যাম্প চলছে। ‘আমাদের পাড়া, আমাদের সমাধান ক্যাম্পে’ কাজও বর্ধিত করা হয়েছে বলে জানান তিনি। মমতার কথায়, এই বিপর্যয়ে যাঁদের নথি হারিয়ে গিয়েছে, তাঁরা রিলিফ ক্যাম্প থেকে আবেদন করলেই, সেখানেই করে দেওয়া হচ্ছে। এরপর মমতা কেন্দ্রের বিরুদ্ধে বড়সড় অভিযোগ আনেন। তিনি ক্ষোভপ্রকাশ করে বলেন, ‘এই বিপর্যয়ে বৃষ্টি-ধস, ও হড়পা বান ভাসিয়ে দিয়েছে দার্জিলিং, কালিম্পং, আলিপুরদুয়ার, জলপাইগুড়ি, কোচবিহারের একাধিক এলাকা। উত্তরবঙ্গে মোট ৩২ জন মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। ৭০ হাজার মানুষ ঘরছাড়া। বিপর্যয়ের পর থেকেই প্রশাসন ও বিপর্যয় মোকাবিলা দফতরের কর্মীরা ত্রাণ ও উদ্ধারকাজের জন্য ঝাঁপিয়ে পড়েন। সেজন্য বহু দুর্গতকে রক্ষা করা সম্ভব হয়েছে বলে মত মুখ্যমন্ত্রীর। এরপর বলেন, এক পয়সাও কেন্দ্র দেয়নি।
পাহাড়ের বহু জায়গায় পথ নিশ্চিহ্ন। বালাসন নদীর ব্রিজ ভাঙায় মিরিক থেকে দুধিয়া হয়ে শিলিগুড়ি যাওয়ার রাস্তা বন্ধ। দার্জিলিংয়ের রোহিনী রোডও বন্ধ। এই অবস্থায় সংস্কারের জন্য বন্ধ করা হয়েছে কালিম্পং ও সিকিমের লাইফ লাইন ১০ নম্বর জাতীয় সড়ক। পাহাড়ের সংশ্লিষ্ট তিনটি রাস্তা বন্ধ থাকলেও, আশার আলো জাগিয়ে ফের পর্যটকের ভিড়ে সরগরম হচ্ছে পাহাড়। এতে করে ব্যবসায়ীদের মধ্যে খুশি ফুটেছে। স্থানীয় সূত্রে খবর, উত্তরবঙ্গের মানুষের এই বিপর্যয়ের সময় রাজ্যের প্রশাসনিক প্রধান হিসাবে পাহাড়বাসীর পাশে যেভাবে দাঁড়িয়েছেন মমতা। তাতে করে পাহাড়ের মানুষের মধ্যে ভরসা জোগাচ্ছে। একি সঙ্গে পর্যটকরা আবারও পাহাড়মুখি হচ্ছেন। স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, প্রশাসনের সহযোগিতায় ভয় কাটিয়ে পাহাড়ে আসছে পর্যটকরা। মঙ্গল ও বুধবার দার্জিলিঙয়ে মানুষের ঢল নেমেছে। এখন প্রায় ৫০ শতাংশের বেশি রুম বুকিং রয়েছে। দীপাবলিতে বুকিংয়ের সেই হার আরও বাড়বে বলেই আশা করছেন হোটেল ব্যবসায়ীদের একাংশ।
দার্জিলিং পাহাড় হোটেল আসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক রেজি লামা সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, ‘বিপর্যয়ের সময় সামান্য কিছু পর্যটক ট্যুর বাতিল করেছিলেন। তবে সেই পরিস্থিতির বদল ঘটেছে। অধিকাংশই ট্যুর রিসিডুল করেছেন। সেই সঙ্গে নতুন বুকিংও হচ্ছে। এমনটা হওয়ায় অনেকেই ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত ব্যবসা বাড়বার বিষয় আশাবাদী।’ অন্যদিকে, গাড়ি চালকদের কথায়, মুখ্যমন্ত্রী বিপর্যয়ের পর যেভাবে পরিস্থিতি নিজ হাতে কন্ট্রোল করছেন তাতে করে মানুষের মধ্যে আশার সঞ্চার হচ্ছে। প্রথমবার মিরিকে পরিস্থিতি দেখলেও এবার দার্জিলিং এসেছেন। তিনি আসার পর থেকে এখানকার পরিস্থিতি নিয়ে মানুষের কাছে পজিটিভ তথ্য যাবে। আবারও স্বাভাবিক রূপ নেবে। দার্জিলিংয়ের চৌরাস্তা, ম্যাল রোড পর্যটকে ভরে উঠবে।
এদিনের প্রশাসনিক বৈঠক থেকে ক্ষয়ক্ষতির হিসাব দিয়ে মমতা জানিয়েছেন, উত্তরের জেলাগুলির মধ্যে দার্জিলিংই সব থেকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, বিশেষত মিরিক। রোহিণীর রাস্তায় ধস নেমে বড়সড় ক্ষতি হয়েছে। পূর্ত দফতরের ইঞ্জিনিয়াররা কাজ করছেন। ওই রাস্তা সারাতে অন্তত ২০-২৫ দিন লাগবে। তত দিন যাতায়াতের জন্য তিনধারিয়া রোড আর পাঙ্খাবাড়ি রোড ব্যবহার করা যাবে। মমতা জানিয়েছেন, দুধিয়ায় যে অস্থায়ী হিউম পাইপ ব্রিজ তৈরি হচ্ছে, সেটাও আর সাত দিনের মধ্যে তৈরি হয়ে যাবে। তা ছাড়া, পাশে আর একটি পাকা সেতু তৈরি করা হচ্ছে। একটা সেতু তৈরি করতে দু’-আড়াই বছর সময় লাগে। পূর্ত দফতর, দমকল থেকে শুরু করে জেলা প্রশাসন; সকলেই দিনরাত কাজ করছেন। দুর্যোগে ৩২ জনের মৃত্যু হয়েছে। তারমধ্যে দার্জিলিঙে ২১, জলপাইগুড়িতে ৯ এবং কোচবিহারে ২ জন মারা গিয়েছেন। মৃত সকলের পরিবারের হাতে ৫ লক্ষ টাকা করে তুলে দেওয়া হয়েছে। প্রতি পরিবারের এক জনকে স্পেশ্যাল হোমগার্ডের চাকরিও দেওয়া হয়েছে।
কেন্দ্রের প্রতিও ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন মমতা। এ বারের দুর্যোগে যাঁদের বাড়ি ভেঙেছে, তাঁদেরকেও ডিসেম্বরে বাংলার বাড়ির টাকা দেওয়া হবে। এই টাকা আসবে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার টাকা থেকে। তাই যার যতটুকু সম্ভব সাহায্য করুন। কেন্দ্র তো কিছুই দিচ্ছে না। ১০০ দিনের টাকা, গ্রামীণ রাস্তা, সর্ব শিক্ষা মিশন, জল স্বপ্নের টাকাও বন্ধ। কিন্তু সামলাচ্ছি তো! মনে রাখবেন মানুষের পাশে আছে সরকার।’

