মুসলিম-যাদব ভোট টানতে ব্যর্থ তেজস্বীর ঔদ্ধত্যেই হার
দিন দর্পণ, পাটনা:
শুক্রবার বিহার বিধানসভা নির্বাচনের ফল ঘোষণার পরে কংগ্রেস-আরজেডি জোটের শোচনীয় পরাজয়ের কারণ নিয়ে শুরু হয়েছে চুলচেরা চর্চা। বিষয়টি রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা নানা দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করছেন। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের অনেকে মনে করছেন, নির্বাচনী রাজনীতির অঙ্কে ভুল করেছেন মুখ্যমন্ত্রী পদপ্রার্থী আরজেডি নেতা লালুপ্রসাদ যাদবের পুত্র তেজস্বী যাদব। ২০২০ সালের নির্বাচনের তুলনায় ২০২৫-এ যাদব প্রার্থীর উল্লেখযোগ্য সংখ্যাবৃদ্ধি করার সিদ্ধান্ত নিয়ে তেজস্বী অঙ্কে ভুল করেছেন মনে করা হচ্ছে। চলতি নির্বাচনে যাদব সম্প্রদায়ের ৫২জন প্রার্থী দাঁড় করানোর সিদ্ধান্তই কাল হয়েছে আরজেডির।
তেজস্বী আরেকটি ভুল করেছেন জাতপাতের অঙ্কে। বিহারে জনসংখ্যার ১৪ শতাংশ যাদব সম্প্রদায়ের। যাদব সম্প্রদায়ের ভোটব্যাঙ্ককে সংহত করতে যাদব সম্প্রদায় বহির্ভূত ভোটারদের বিরাগভাজন হয়েছেন তেজস্বী। উচ্চবর্ণের ভোটাররা এবং অনগ্রসর সম্প্রদায়ের ভোটাররা মহাগঠবন্ধন থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছেন আরজেডি যাদবদের উপর বেশি গুরুত্ব আরোপ করায়। এই সুযোগ নিয়ে অতীতে আরজেডির ‘যাদবরাজ’-এর সমালোচনায় আসরে নেমে ভোটারদের মন ভেজাতে সক্ষম হয়েছে এনডিএ।
বিহারে এনডিএ জোটের জয়ের পরে জাতীয় সংবাদ মাধ্যমে যে বিশ্লেষণাত্মক নিবন্ধগুলি প্রকাশিত হয়েছে, তাতে পরাজয়ের দায় বর্তেছে তেজস্বীর উপর। যেমন বলা হয়েছে, তেজস্বীর নেতৃত্বাধীন আরজেডি জোট শরিকদের গুরুত্ব দেয়নি। এরই ফল ভুগতে হচ্ছে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, কংগ্রেস, বাম দলগুলি এবং অন্য ছোট শরিকদের তেজস্বী তথা আরজেডি যথেষ্ট গুরুত্ব না দেওয়ার দরুণ বিরোধী জোটের অভ্যন্তরে মতান্তর দেখা দেয়। এছাড়া তেজস্বী নিজের ভাবমূর্তি বড় করতেও মরিয়া ছিলেন। জোটের তরফে প্রকাশিত নির্বাচনী ইস্তেহারে লেখা ছিল, ভোটারদের উদ্দেশে ‘তেজস্বীর আর্জি’। এটা কার্যত জোট নেতৃত্বকে উপেক্ষার সামিল।
এমনকি নির্বাচনী প্রচারে মহাগঠবন্ধনের তরফে যে পোস্টারগুলি ছাপা হয়েছে, বিহারে ভোটযুদ্ধে অবতীর্ণ লোকসভা বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধির ছবি সেখানে ছোট আকারে প্রকাশিত হয়েছে। অন্যদিকে, এনডিএ জোটে ২০২৫-এর বিহার নির্বাচনে মতান্তর দেখা দেয়নি। উপরন্তু প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নির্বাচন কমিশন ভোটের দিনক্ষণ ঘোষণা করার ১০ দিন আগে ‘মুখ্যমন্ত্রী মহিলা রোজগার যোজনা’ চালু করে তুরুপের তাস খেলেছেন।
এবার বিহার বিধানসভা নির্বাচনের প্রচারে এনডিএ এবং মহাগঠবন্ধন দু’পক্ষ দেদার প্রতিশ্রুতির বন্যা বইয়েছে। ওয়াকিবহাল মহলের মতে, তেজস্বীর জনমোহিনী প্রতিশ্রুতি ছিল, জিতলে বিহারের নাগরিক প্রত্যেক পরিবারের একজন সদস্যকে সরকারি চাকরি দেওয়া হবে। ভোটাররা ওই প্রতিশ্রুতি গায়ে মাখেননি। কেননা তেজস্বী প্রতিশ্রুতি দিলেও ওই প্রতিশ্রুতি কীভাবে বাস্তবায়িত করবেন, সেব্যাপারে ভোটারদের সামনেনির্দিষ্ট ছক হাজির করতে না পারায় তেজস্বীর কথায় ভোটাররা সাড়া দেননি মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা।
তেজস্বী কথা দিয়েছিলেন, ক্ষমতায় এলে ওয়াকফ আইন কার্যকর করবেন না। এবিষয়টি অমুসলিম ভোটারদের একাংশ মুসলমান তোষণ হিসেবে মনে করেছেন। ফলে ভোট বিপক্ষে গিয়েছে। এছাড়া এনডিএ জোট বিহারে লালুপ্রসাদ জমানার ‘জঙ্গলরাজ’ নিয়ে লাগাতারভাবে যে অভিযোগ তুলেছে, তা তেজস্বী পরোক্ষভাবে সমর্থন করেছেন। এমনকি নির্বাচনী সমাবেশগুলিতে লালুপ্রসাদের ছবিও যতদূর সম্ভব কম ব্যবহার করেছেন। এদিকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বিহারে ভোট প্রচারে এসে লাগাতারভাবে দাবি করেছেন, ‘তেজস্বী লালুপ্রসাদের পাপ আড়াল করতে চাইছে।’ এর বিরোধিতায় তেজস্বী যথাযথ কোনও কৌশলও গ্রহণ করতে পারেননি।
সূত্রের খবর, তেজস্বী মুসলমান ও যাদব ভোট টানতে যে নীতি নিয়েছেন, তা শেষমেশ ব্যর্থ হয়েছে। যদিও রাজ্যে মুসলমান অধ্যুষিত ৩২টি বিধানসভা কেন্দ্রে দুদফাতে গতবারের তুলনায় ১২ দশমিক ৯ শতাংশ বেশি ভোট পড়েছে। সীমাঞ্চলে সর্বোচ্চ সংখ্যক মুসলমান সম্প্রদায়ের নাগরিক বসবাস করেন। সীমাঞ্চলের চারটি জেলায় গড়ে ৭৫ দশমিক ৯ শতাংশ ভোট পড়েছে। এছাড়া বিহারের কিষাণগঞ্জ জেলায় মুসলিম ভোটের হার ছিল সর্বোচ্চ। মুসলমান অধ্যুষিত এই জেলায় ৭৮ দশমিক ১৬ শতাংশ ভোট পড়েছে।
সূত্রের খবর, মুসলিম অধ্যুষিত ৩২টি বিধানসভা কেন্দ্র, যা সীমাঞ্চল এবং কোশির অন্তর্গত এই এলাকাগুলিতে ২০২০ সালে ভোটের হার ছিল ৬০ দশমিক ২ শতাংশ। ২০২৫-এ ভোটের হার বেড়ে ৭৪ দশমিক ৫ শতাংশে এসে দাঁড়িয়েছে। কোনদিকে পড়েছে মুসলিম ভোট, তা নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ এখন সময়ের অপেক্ষা।

