পরিযায়ীর পরিবারে আহাজারি খুনিদের ফাঁসির দাবিতে ফুঁসছে জুয়েলের গ্রাম

রাজন্যা নিউজ ব্যুরো

সুতির পরিযায়ী শ্রমিক জুয়েল রানার মৃতদেহ শুক্রবার এসে পৌঁছায় গ্রামে। মৃতদেহ গ্রামে আসতেই কান্নায় ভেঙে পড়ে গোটা গ্রাম। জুয়েল রান্নার পরিবারেও রোজগেরেকে হারানোর চরম আর্তনাদ। তবে তারমধ্যেই ক্ষোভে ফুঁসে ওঠে মুর্শিদাবাদের সুতির চকবাহাদুরপুর গ্রাম। তাদের একটাই দাবি, জুয়েল রানার খুনিরে ফাঁসি চাই। একই দাবি করেছেন জুয়েল রানার মা নাজেমা বিবিও। ছেলের মৃতদেহ আঁকড়ে ধরে বুকফাটা কান্না মায়ের। রড, লাঠি দিয়েছে নৃশংসভাবে পিটিয়ে মেরেছে ছেলেকে। দুচোখ দিয়ে ঝরে পড়েছে অশ্রুর বন্যা। ছেলেকে তো আর ফিরে পাবেন না। তবে তাঁর দাবি, খুনিদের ফাঁসি চাই।
শুক্রবার বেলা সাড়ে ১০ টা নাগাদ কফিনবন্দি জুয়েল রানার দেহ ফিরেছে গ্রামে। কাজ করতে ওড়িশার সম্বলপুরে গিয়েছিলেন মুর্শিদাবাদের পরিযায়ী শ্রমিক জুয়েল রানা। সেখানে আইন্থাপালি থানা এলাকার দানিপালি এলাকায় অজ্ঞাতপরিচয় দুষ্কৃতীরা তাঁকে বাংলাদেশি সন্দেহে পিটিয়ে খুন করে বলে অভিযোগ। এদিন পরিযায়ী শ্রমিকের দেহ সুতির চক বাহাদুরপুর গ্রামে ঢুকতেই কান্নায় ভেঙে পড়েন আত্মীয়-পরিজন সহ গোটা গ্রাম। হাজার হাজার নারী পুরুষ বিজেপির গুন্ডাবাহিনী দের হাতে পিটিয়ে খুন হওয়া জুয়েল রানার মৃতদেহ দেখতে ভিড় জমায়।
২১ বছরের জুয়েল রানার মৃতদেহ ফেরার আগেই ঘটনাস্থলে মোতায়েন করা হয় বিশাল পুলিশ বাহিনী। মৃত পরিবার-পরিজনদের সমবেদনা জানাতে উপস্থিত ছিলেন সুতির বিধায়ক ঈমানি বিশ্বাস, সুতি ১ ব্লকের বিডিও, সুতির আইসি সুপ্রিম রঞ্জন মাঝিদের পাশাপাশি প্রদেশ কংগ্রেসের নেতা হাসানুজ্জামান বাপ্পা ও আলী রেজা’সহ বাম-কংগ্রেস এবং তৃণমূলের নেতারা। মৃত পরিযায়ী শ্রমিকের মা নাজেমা বিবি ছেলের মৃত্যুদেহের পাশে বসে কাঁদতে কাঁদতে বলেন, গুন্ডারা বিনা কারণে ছেলেদের বাসার ভিতরে ডুকে গণপিটুনি শুরু করে। কোনও রকম কথা বলার সময় দেয়নি। রান্না যখন করছিল তখন অতর্কিত ভাবে ডুকে লোহার রড ও লাটি দিয়ে মাথায় মারে আমার ছেলেকে। হাসপাতালে নিয়ে যেতে যেতেই ছেলে শেষ। যারা আমার ছেলেকে খুন করেছে তাদের ফাঁসির সাজা চাই।
রুজিরুটির সন্ধানে ওড়িশায় গিয়েছিল বছর ২১’এর জুয়েল রানা। কিন্তু, কে জানত সেখানেই শেষ হয়ে যাবে জীবনটা! পরিবারের অভিযোগ, জুয়েলকে নৃশংসভাবে পিটিয়ে খুন করা হয়েছে। আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন আরও ২ পরিযায়ী শ্রমিক আকির শেখ ও পলাশ শেখ। মৃত পরিযায়ী শ্রমিকের কাকা শেখ আনোয়ার বলেন, ৬-৭ জন হঠাৎ বাসার ভিতরে ডুকে ওদের মারধর শুরু করে দেয়। বার বার কাকুতি মিনতি করলেও কোনও কথায় শোনেনি। জুয়েল রানাকে রড ও লাটি দিয়ে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে।
মৃত জুয়েল রানা মা নাজেমা বিবি বলেন, ২০ ডিসেম্বর, ওড়িশার সম্বলপুরের এঠাতালিতে রাজমিস্ত্রির কাজ করতে গিয়েছিল জুয়েল রানা, আকির শেখ ও পলাশ শেখ। গত বুধবার রাতে তাঁদের উপর চড়াও হয় কয়েকজন দুßৃñতী।
প্রত্যক্ষদর্শীর অভিযোগ, বাংলাভাষায় কথা বলার কারণে, বাঙালি মুসলিম হওয়ার জেরে জয় শ্রীরাম স্লোগান দিতে দিতে মুর্শিদাবাদ ও মালদার ৩ পরিযায়ী শ্রমিককে বেধড়ক মারধর শুরু করে। বাসার ভিতরে আরও ৪ জন ছিলেন। আকিব মার খেয়ে ছুঁটে যায় ঘরে, আমাদের জানায় বেশ কয়েকজন হঠাৎ করে রান্না ঘরের বাসায় ঢুকে মারধর করছে। আমরা একসাথে বের হতেই দুßৃñতীরা পালিয়ে যায়। তার আগেই জুয়েল রানার দেহ মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। মাথা দিয়ে তীব্র রক্তক্ষরণ হচ্ছিল। কি করবো আমরা ভেবে পাচ্ছিলাম না। স্থানীয় কাজের সাইডের মালিক পুলিশে ফোন করে সবিস্তরে ঘটনা জানান। পুলিশ আসলেই জুয়েল রানাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যায়। হাসপাতালে নিয়ে যেতে যেতে সব শেষ হয়ে যায়।
এদিকে ওড়িশা রাজ্যের রাজ্য পুলিশের তরফে জানানো হয়েছে ঘটনায় ৬ জন অভিযুক্তকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ওড়িশা রাজ্য পুলিশের ডিজিপি যোগেশ বাহাদুর কুরানি সংবাদ সংস্থাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, ওড়িশার সম্বলপুরের এঠাতালি এলাকায় পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের মুর্শিদাবাদ জেলার জুয়েল রানাকে নৃশংসভাবে খুন করা হয়েছে। নৃশংস হত্যাকান্ডের ঘটনায় ৬ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে! ঘটনায় ৬ জন অভিযুক্ত এমন ঘটনা ঘটিয়েছে! সক্রিয় ভূমিকা পালন করে ৬ অভিযুক্তকে ২৪ ঘন্টার মধ্যে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা হবে।
বাংলা ও বাঙালি বলে ওপর অত্যাচার করা হচ্ছে সেই প্রশ্নের উত্তরে ওড়িশার পুলিশ কর্তা জানান, নিজের হাতে কেউ আইন তুলে নিলে, তাদের বিরুদ্ধে নেওয়া হবে কড়া ব্যবস্থা।
শুক্রবার জুম্মার নামাযের পর ১.৩০ মিনিট নাগাদ সুতির চক বাহাদুরপুর গ্রামের কবরস্থানে ওড়িশায় উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের হাতে খুন হওয়া পরিযায়ী শ্রমিক জুয়েল রানার জানাযা সম্পূর্ণ হয়ে গ্রামের কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়। হাজার হাজার মানুষ দাফন ও জানাযায় সামিল হয়। কেন্দ্র সরকারকে বার্তা দিতে বিজেপি ও উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের বার্তা দিতে জাতীয় পতাকা বহন করা হয় কবরস্থানে নিয়ে যাওয়ার সময়। দোয়া করার সময় পরিযায়ী শ্রমিক ও বাঙালি ও বাংলা ভাষায় কথা বলা মানুষদের জন্য বিশেষ দোয়া প্রার্থনা করা হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *