ইরানে হামলার দ্বারপ্রান্তে যুক্তরাষ্ট্র
রাজন্যা নিউজ ব্যুরো, ২৫ জানুয়ারি
যুক্তরাষ্ট্রের সশস্ত্র বাহিনী ইরানে একটি বড় ধরনের সামরিক হামলা চালানোর প্রস্তুতি প্রায় সম্পন্ন করেছে বলে দাবি করেছে ইসরাইল। রবিবার ইসরাইলি সংবাদমাধ্যম চ্যানেল ১২-এর এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, মার্কিন বাহিনীর মোতায়েন প্রক্রিয়া শেষ হতে আরও কয়েক দিন সময় লাগতে পারে এবং বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে ওয়াশিংটনের সামরিক উপস্থিতি গত আট মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
যদিও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এখনও চূড়ান্ত কোনও নির্দেশ দেননি, তবুও সম্ভাব্য ইরানি পাল্টা হামলার আশঙ্কায় ইসরাইল অভ্যন্তরীণভাবে ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ শুরু করেছে। এই উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যে ইসরাইলের হোম ফ্রন্ট কমান্ড জানিয়েছে, বর্তমানে তারা কোনও নতুন গণ-নির্দেশনা জারি না করলেও পরিস্থিতির পরিবর্তন হলে তাৎক্ষণিকভাবে তা জানানো হবে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই বিশাল শক্তিবৃদ্ধির আওতায় রয়েছে বিমানবাহী রণতরি ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কন, গাইডেড মিসাইল ডেস্ট্রয়ার, ত্রুজার এবং একাধিক যুদ্ধবিমান স্কোয়াড্রন। এছাড়া অঞ্চলজুড়ে আকাশ ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী ও বিস্তৃত করা হয়েছে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এর আগেই নিশ্চিত করেছিলেন, একটি ‘বিশাল নৌবহর’ ইরানের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ইরানে শুরু হওয়া সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনে তেহরানের কঠোর অবস্থানের কারণে ট্রাম্প বারবার সামরিক অভিযানের হুঁশিয়ারি দিয়ে আসছিলেন। হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্ট নিউজ এজেন্সি (এইচআরএএনএ) অনুমান করছে যে, ইরানে অভ্যন্তরীণ হিংসায় এ পর্যন্ত প্রায় ৪ হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন এবং হাজার হাজার মানুষকে গ্রেফতার করা হয়েছে, যদিও ইন্টারনেট বিচ্ছিন্ন থাকায় এসব তথ্যের সঠিকতা যাচাই করা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অন্যদিকে ইরান এই সম্ভাব্য হামলার বিরুদ্ধে কড়া প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে জানিয়েছে, যেকোনও ধরনের মার্কিন হামলাকে তারা একটি ‘সর্বাত্মক যুদ্ধ’ হিসেবে গণ্য করবে। ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-এর কমান্ডার মুহাম্মদ পাকপুর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, তেহরান এখন ‘ট্রিগারে আঙুল’ দিয়ে প্রস্তুত রয়েছে এবং যেকোনো উসকানির পূর্ণাঙ্গ ও বিধ্বংসী জবাব দেওয়া হবে।
ইরানি কর্তৃপক্ষ স্পষ্ট করেছে, হামলার পরিধি সীমিত বা ব্যাপক যাই হোক না কেন, তাদের প্রতিক্রিয়া হবে অত্যন্ত কঠোর। এই দ্বিমুখী অবস্থানের ফলে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে একটি বিধ্বংসী যুদ্ধের আশঙ্কা প্রবল হয়ে উঠেছে।
আন্তর্জাতিক সামরিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, আগামী কয়েক দিন মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যেকার এই স্নায়ুযুদ্ধ যদি শেষ পর্যন্ত সরাসরি সংঘাতে রূপ নেয়, তবে তা পুরো অঞ্চলের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ভারসাম্যকে চরম ঝুঁকিতে ফেলবে।
বর্তমানে দুই দেশই নিজ নিজ অবস্থানে অনড় থাকায় কূটনৈতিক সমাধানের পথ ক্রমশ সংকুচিত হয়ে আসছে। ইসরাইল ও আমেরিকার মিত্র দেশগুলো এখন যেকোনও পরিস্থিতির জন্য উচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করছে, যা বিশ্বজুড়ে জ্বালানি বাজার এবং নিরাপত্তার ক্ষেত্রে নতুন অস্থিরতা তৈরি করেছে।
অন্যদিকে, তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান বলেছেন, ইরানের ওপর হামলার সুযোগ খুঁজছে ইসরাইল। তিনি এই আশঙ্কার কথা তেহরানের নেতৃত্বকেও জানিয়ে দিয়েছেন। ফিদান বলেন, গত বছরের ৩০ নভেম্বর তেহরানে ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এই সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তিনি বলেন, ইসরাইল যদি এমন কোনও পদক্ষেপ নেয়, তবে তা পুরো অঞ্চলের স্থিতিশীলতাকে আরও নষ্ট করবে।
শুক্রবার এক সাক্ষাৎকারে ফিদান বলেন, ‘আমি আশা করি তারা অন্য কোনও পথ খুঁজে পাবে। কিন্তু বাস্তবতা হল ইসরাইল বিশেষভাবে ইরানের ওপর হামলা চালানোর সুযোগ খুঁজছে।’ ফিদান সম্প্রতি তেহরান সফরকালে ইরানি কর্মকর্তাদের সরাসরি তার উদ্বেগের কথা জানান। তিনি বলেন, ‘আমি বন্ধু হিসেবে তাদের সবকিছু বলেছি। আর আপনারা জানেন, বন্ধুরা সব সময় তিতা সত্য কথা বলে।’ এর আগে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোগান ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন। তিনি জানান, তুরস্ক ইরানে যে কোনও বিদেশি হস্তক্ষেপের বিরোধী এবং তারা প্রতিবেশী দেশের শান্তি ও স্থিতিশীলতাকে গুরুত্ব দেয়।

